এই প্রশ্নের জবাব দেবে কে?

মো: আকতার হোসাইন // ব্যাংকার ও লেখক:
বর্তমান বাংলাদেশে সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত বিষয় হলো মূল্যস্ফীতি, পে-স্কেল, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও শিশু অপহরণ। মূল্যস্ফীতি, পে-স্কেল ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি একই সূত্রে গাঁথা। পে-স্কেল ঘোষণা করায় মূল্যস্ফীতি আরও বৃদ্ধি পাবে, এটা স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে মূল্যস্ফীতির আঁতুড়ঘর বলা হয়। সেই জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি কতটা যৌক্তিক হলো? বিশেষ করে ১৭ সেপ্টেম্বর পে-স্কেল ঘোষণা করার দুই দিন পর হঠাৎ করে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি জনমনে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। তাই জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির আগে আরও বেশি ভাবনা-চিন্তা করে, আর একটু সময় নিয়ে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করা যেত কি না, সেই প্রশ্ন সবাই করছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিশু অপহরণ।
গত ১৮ এপ্রিল ২০২৬ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করা হয়, যেখানে ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়। আবার গত ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে আরও ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। সেই সঙ্গে কেরোসিন ১৫৫, পেট্রল ১৬০ ও অকটেনের দাম ১৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। নতুন দাম ২১ সেপ্টেম্বর থেকেই কার্যকর হয়েছে। অথচ দৈনিক প্রথম আলোর ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, “চলতি মাসে প্রায় ১৩ কোটি ১৩ লাখ লিটার ডিজেল খালাস করেছে বিপিসি। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ও বাংলাবান্ধা স্থল কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, বন্দর পর্যন্ত প্রতি লিটার ডিজেলের গড় আমদানি ব্যয় ছিল ১২৬ টাকা ৪১ পয়সা। এর ওপর লিটারে প্রায় ৩৩ টাকা শুল্ক-কর দেওয়ায় ব্যয় দাঁড়ায় ১৫৯ টাকা ৪১ পয়সা। বন্দর থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পরিচালন, পরিবহন, ডিলার কমিশন, উন্নয়ন তহবিলসহ আরও ১৭ টাকা ২৭ পয়সা খরচ হয়। সব মিলিয়ে প্রতি লিটারে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১৭৬ টাকা ৬৮ পয়সা।” যদিও বিপিসির চেয়ারম্যান বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারদর, শুল্ক-কর ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেলের ব্যয় প্রায় ২০৫ টাকা। অর্থাৎ প্রতি লিটারে এখনও ঘাটতি ৭০ টাকা।

কিন্তু এই ঘাটতি যদি সঠিক হয়, তাহলেও ৩৩ টাকা শুল্ক-কর ধার্য কতটা যৌক্তিক? যেখানে বাংলাদেশ ২০২২ সাল থেকে উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে ভুগছে। অথচ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরে জ্বালানি তেল আমদানিতে শুল্ক-কর বাবদ সরকারকে প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা দিয়েছে। একই সঙ্গে সংস্থাটি ১০ বছরে নিট মুনাফা করেছে ৫৩ হাজার ১৩২ কোটি টাকা। যে সংস্থাটি অলাভজনক, সেই প্রতিষ্ঠানটি সরকারকে মুনাফা করে দিচ্ছে, আর যার মুনাফা করে সরকারের কোষাগারে জমা করার কথা, এমন অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানে রয়েছে। একটি সহজ-সরল হিসাব মেলানো যাক। ধান উৎপাদন অনেকটা প্রকৃতিনির্ভর, তারপরও হিসাব মেলানো যাক। ধান উৎপাদনের জন্য প্রথমেই হাল চাষ করার জন্য যে ট্রাক্টর ব্যবহার করা হয়, সেই ট্রাক্টরটি ডিজেলচালিত হওয়ায় তার ব্যয় বিশ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। আবার কীটনাশক ও সার ব্যবহারেও বিশ শতাংশ খরচ বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে মজুরিও বৃদ্ধি পাবে। সুতরাং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি মানেই চক্রবৃদ্ধি সুদকষা গণিতের সেই সূত্রকেও হার মানাবে। সরকার বিপিসির মাধ্যমে বিগত ১০ বছরে যে ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা পেল, তা আসলে সরকারকে কতটুকু সুবিধা দিয়েছে, তা ভাববার বিষয়। সরকার হয়তো এই খাতে আর্থিক যে সহায়তা পেল, তার চেয়ে কয়েকগুণ ভর্তুকি হয়তো সরকারকে দিতে হয়েছে। সুতরাং সরকারের দক্ষতা ও সফলতা নির্ভর করে তার আর্থিক খাতে সঠিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। সেই সিদ্ধান্ত যদি সরকারকে বিপদে ফেলে, তাহলে তার ভবিষ্যৎ সুখকর হবে না।

একটি বিষয় লক্ষ্য করা যায়, মূল্যস্ফীতির নিয়ন্ত্রণ যেন, শুধুমাত্র বাংলাদেশ ব্যাংকের একারই কাজ। বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে সুদের হার বৃদ্ধি করে রাখল। ফলে মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত না হলেও দেশের বিনিয়োগে মন্দা দেখা দিল। একই সঙ্গে বেকারত্বের হারও বেড়ে গেল। অথচ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি না করে এবং শুল্ক-কর ধার্য না করে, প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে হলেও জ্বালানি তেলের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে মূল্যস্ফীতি খুব সহজে নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের মত। তবে অনেকেই বলবে চোরাচালানের কথা, কিন্তু তার জন্য বর্ডার গার্ড রযেছে।
অপরদিকে, বর্তমান সময়ে আলোচিত আরেকটি বিষয় হলো শিশু অপহরণ। যেমন, গত ৩ সেপ্টেম্বর পুলিশ সদর দপ্তর সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায়, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হলেও ৮৭ শতাংশের বেশি শিশু উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া শিশুর সংখ্যা ১৩ হাজার ৬৭৯। সেই হিসাবে নিখোঁজ রয়েছে ২ হাজার ৩৮ জন, যা মোট নিখোঁজ শিশুর প্রায় ১৩ শতাংশ। অর্থাৎ বিশাল একটি অংশ এখনো নিখোঁজ, যেখানে একটি শিশুও নিখোঁজ কাম্য নয়। অতি সম্প্রতি অপ্রিতমের ঘটনা সারা বাংলাদেশকে নাড়া দিয়েছে। অনেকে বলছেন, অপ্রিতম একজন টিকটকার এবং অসম বয়সী বন্ধুদের সঙ্গে মিশেছেন, তার দায়ভার তার বাবা-মায়ের রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র কি তার দায়িত্ব এড়াতে পারবে? পারবে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য কমাতে? আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবনতি হয়েছে, তা থেকে দেশকে কতটুকু সুরক্ষা দিতে পারবে?
আমাদের দেশের শুরু থেকে আজ অবধি নেতৃস্থানীয়, অর্থাৎ সরকারপ্রধানের দক্ষতা নিয়ে জনমনে অসন্তোষ রয়েছে। যেমন, বিবিসি শ্রোতা জরিপে শ্রেষ্ঠ বাঙালি বলা হয় শেখ মুজিবুর রহমানকে এবং তাকে ভালোবেসে বঙ্গবন্ধু ও জাতির পিতা উপাধি দেওয়া হলো। অথচ সেই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বা রাষ্ট্রনায়কের প্রতি ঘৃণা জন্মাতে সময় লাগল না। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানকে নিয়ে দুটি উদাহরণ দেওয়া যাক। যেমন, মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় অধিনায়ক লে. জে. অরোরা বলেন, “পরবর্তী সময়ে আমি যখন তার সঙ্গে (মুজিব) আরও ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশার সুযোগ পেলাম, তখন আমি উপলব্ধি করলাম যে, তিনি প্রশাসনিক বিষয়ে যত না দক্ষ, জনগণ উদ্বুদ্ধ করতে, তাদেরকে খেপিয়ে তুলতে তিনি তার চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ ছিলেন। তিনি কথা বলে লোকজনকে নাচাতে পারতেন। কিন্তু প্রশাসন চালানোর ব্যাপারে তিনি তেমন দক্ষ ছিলেন না”। আবার উল্টো চিত্র লক্ষ্য করা যায়, যেমন মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রনায়ক মাহাথির বিন মোহাম্মদ বা সিঙ্গাপুরের রাষ্ট্রনায়ক লি কুয়ান ইউ, যাদেরকে শুধু তাদের দেশ নয়, সমগ্র বিশ্ব শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। বাংলাদেশে এমন একজন দক্ষ ও বিচক্ষণ রাষ্ট্রনায়কই পারে বাংলাদেশকে সুখী-সমৃদ্ধিশালী দেশে পরিণত করতে।
আবার নিউজউইক পত্রিকায় ১৯৭৪ সালের ১৫ জুন বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় শেখ মুজিবের সামগ্রিক ব্যর্থতা সম্পর্কে টনি ক্লিন্টন রচিত ‘চাটুকার পরিবেষ্টিত শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে’ শিরোনামে একটি সংবাদ নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। সংবাদ নিবন্ধের ছত্রে ছত্রে এক ভয়ানক ভবিষ্যতের আশঙ্কা ফুটে উঠেছিল। নিবন্ধের একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়, কিছুসংখ্যক চাটুকার পরিবেষ্টিত শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থা এমন হয়েছে যে, নিজের ভুল-ভ্রান্তিগুলো পর্যন্ত জানতে পারা তার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, এ চাটুকারের দল কেবল সেই সংবাদগুলোই তার কানে তোলে, যে সংবাদগুলো তিনি নিজে উদগ্রীব হয়ে জানতে ও শুনতে চান। শুধু বৈদেশিক নীতি ছাড়া শেখ মুজিবের নেতৃত্ব প্রায় সম্পূর্ণ অযোগ্য প্রমাণিত হয়েছে।
সুতরাং, চাটুকার আমাদের দেশের জাতীয় ও পুরোনো সমস্যা। কিন্তু দেশ নানা রকম সমস্যায় জর্জরিত। তার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও শিশু অপহরণ। সেই সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে নানা অনিয়ম ও অর্থ কেলেঙ্কারির মতো বিষয় তো রয়েছে, রয়েছে ব্যাংকিং খাতে দৈন্যতা। বাংলাদেশ খেলাপি ঋণে হয়েছে চ্যাম্পিয়ন। এই সব বিষয়গুলোতে রাষ্ট্র পরিচালনায় শীর্ষস্থানীয়দের কাছে প্রশ্ন করবে কে, আর জবাবই দেবে কে?

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *