ডাঃ ফাহমিদা সুলতানা জোনাকী:
প্রতিবছর বর্ষা কিংবা বর্ষা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে দেখা যায়। বৃষ্টির পানি জমে থাকা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং বাড়ির আশপাশে পড়ে থাকা পরিত্যক্ত পাত্রে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার ঘটে। ফলে বর্ষা শেষে অনেক সময় ডেঙ্গুর সংক্রমণ আরও ব্যাপক আকার ধারণ করে। হাসপাতালগুলোতে বাড়তে থাকে জ্বর, শরীরব্যথা, মাথাব্যথা ও দুর্বলতা নিয়ে আসা রোগীর সংখ্যা।
ডেঙ্গু কেবল একটি সাময়িক স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়; এটি বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ। অপরিকল্পিত নগরায়ণ,দুর্বল পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা, জলাবদ্ধতা, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত টায়ার,প্লাস্টিকের পাত্র কিংবা বাড়ির ছাদ ও বারান্দায় জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি করে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে মানুষের ঘনবসতি ও অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।রাজধানী ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন নগর এলাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) ডেঙ্গু ড্যাশবোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে নতুন করে ১ হাজার ৫৬১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং মারা গেছে আরও ৬ জন। এ নিয়ে চলতি বছরের শুরু থেকে ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ৮৩৭ জনে এবং যেখান মৃত্যুর সংখ্যা ১৪৯ জন। যা গত বছরে একই সময়ে মৃত্যুর সংখ্যা ছিলো ১৪৭ জন। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি। ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র ১৩ দিনেই ডেঙ্গুতে ১৫,৯৯১ জন আক্রান্ত যার মধ্যে ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ বর্ষা-পরবর্তী সময় যত পার হচ্ছে , ডেঙ্গুর ঝুঁকিও তত স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু সিটি করপোরেশন, পৌরসভা কিংবা স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। কারণ এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থলের বড় একটি অংশ তৈরি হয় মানুষের বসতবাড়ি, ছাদ, বারান্দা, নির্মাণাধীন ভবন ও আশপাশের জমে থাকা পানিতে। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রথম এবং সবচেয়ে কার্যকর স্তর হতে পারে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সচেতনতা। নিজের ঘর, আঙিনা ও কর্মস্থল পরিষ্কার রাখা, কোথাও পানি জমতে না দেওয়া এবং নিয়মিত এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার অভ্যাসই হতে পারে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে আমাদের প্রথম প্রতিরোধব্যবস্থা।তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রথম দায়িত্বটি শুরু হতে হবে নিজের ঘর থেকেই।
প্রতিটি পরিবারকে সপ্তাহে অন্তত এক দিন নিজেদের বাড়ি ও আশপাশ ভালোভাবে পরিষ্কার করা উচিত। ফুলের টবের নিচের ট্রে, বালতি, ড্রাম, বোতল, ভাঙা পাত্র, পরিত্যক্ত টায়ার, নারকেলের খোসা কিংবা যেকোনো ছোট পাত্রে পানি জমে আছে কি না, তা দেখতে হবে। পানি জমে থাকলে তা ফেলে দিয়ে পাত্রটি পরিষ্কার করতে হবে। যেসব পাত্রে পানি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন, সেগুলো ঢেকে রাখতে হবে। একই সঙ্গে ছাদ, নির্মাণাধীন স্থাপনা ও বাড়ির আঙিনায় পানি জমার সুযোগ বন্ধ করতে হবে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি—এডিস মশা সাধারণত অপরিষ্কার পানির পাশাপাশি পরিষ্কার বা স্বচ্ছ পানিতেও বংশবিস্তার করতে পারে। তাই শুধু নোংরা-আবর্জনাময় স্থান পরিষ্কার করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; বাড়ির ভেতর ও আশপাশে কোথাও সামান্য পানি জমে আছে কি না, সেটিও নিয়মিত খুঁজে দেখা প্রয়োজন।
এছাড়াও ব্যক্তি সচেতনতার পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ববোধও জরুরি। একটি বাড়ি পরিষ্কার রেখে পাশের বাড়ির ছাদে বা নির্মাণস্থলে পানি জমে থাকলে পুরো এলাকার মানুষ ঝুঁকিতে থাকতে পারে। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধকে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার গণ্ডি থেকে বের করে পাড়া-মহল্লাভিত্তিক সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, মসজিদ-মাদ্রাসা, বাজার কমিটি কিংবা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে এ কাজে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের সতর্ক করিয়ে দিচ্ছে—ডেঙ্গু মোকাবিলা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়। সরকারকে যেমন মশকনিধন ও জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম জোরদার করতে হবে, তেমনি নাগরিকদেরও নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। কারণ এডিস মশার জন্মস্থান যদি আমাদের বাড়ির ছাদ, বারান্দা কিংবা উঠানেই তৈরি হয়, তাহলে শুধু রাস্তা বা সড়কে ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
আজ কোথাও জমে থাকা পানি ফেলে দেওয়া হয়তো খুব ছোট কাজ মনে হতে পারে। কিন্তু সেই ছোট কাজটিই হয়তো একটি পরিবারের একজন সদস্যকে ডেঙ্গু থেকে রক্ষা করতে পারে। একটি পাড়া বা মহল্লা যদি একসঙ্গে পরিচ্ছন্ন থাকে, তাহলে একটি বড় এলাকাকে নিরাপদ রাখার পথ সহজেই তৈরি হয়।কারণ ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধক দেয়াল কোনো হাসপাতাল নয়—আমাদের নিজের ঘর।