‎সৈকত নগরীতে বাসাভা পেট সামিটের দ্বিতীয় দিন: গবেষণা উপস্থাপনায় মুখর ভেটেরিনারিয়ানরা

‎ডাঃ ফাহমিদা সুলতানা জোনাকী:
‎রাত তখন অনেক গভীর। ঘড়ির কাঁটা মধ্যরাত ছুঁইছুঁই। দিনের ব্যস্ত কক্সবাজারকে যেন চিনতেই পারছি না। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে মানুষের কোলাহল, আলো আর হাসির শব্দে মুখর ছিল চারপাশ, সেখানে এখন এক অন্য শহর–নীরব, শান্ত, অথচ ভীষণ জীবন্ত।
‎
‎সমুদ্রের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই প্রথম যে শব্দটি আমাকে থামিয়ে দিল, তা ঢেউয়ের। অন্ধকারের ভেতর থেকে একের পর এক ঢেউ ছুটে এসে তীরে আছড়ে পড়ছে। ফিরে যাচ্ছে, আবার আসছে। মনে হলো, এই বিশাল সমুদ্রের কাছে রাত বলে যেন কিছু নেই—নিজস্ব ছন্দে সে অনবরত কথা বলে যাচ্ছে।
‎
‎আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি। শহরের আলো পেরিয়ে যতটা দেখা যায়, তার চেয়েও বেশি অন্ধকারের মধ্যে যেন আকাশটা বড় হয়ে উঠেছে। বালুর ওপর খালি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে বুঝার চেষ্টা করছি, রাতের কক্সবাজার শুধু দেখার নয়—অনুভব করার জায়গা।
‎
‎মাঝেমধ্যে দূরে মানুষের ছায়া দেখা যায়। কেউ হয়তো সমুদ্র দেখছে, কেউ গল্প করছে, কেউ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে। প্রত্যেকের নিশ্চয়ই নিজের নিজের গল্প আছে। অথচ রাতে এসে সবাই যেন একই গল্পের অংশ—একটি বিশাল সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ছোট্ট জীবনটাকে নতুন করে দেখার গল্প।
‎
‎সেই গল্পেরই পরের সকাল।
‎
‎সূর্যের আলো ফুটতেই কক্সবাজার হয়তো তার চেনা ব্যস্ততায় ফিরেছে। শত শত পর্যটক, তাদের ঘিরে নানা আয়োজন। নোনাজলের এই শহরে পর্যটন আর জ্ঞান আহরণের উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভেটেরিনারিয়ানদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে BASAVA Pet Summit-এর দ্বিতীয় দিনের আয়োজন। সমুদ্রের ঢেউয়ের মতোই যেন সম্মেলনকক্ষেও একের পর এক নতুন ভাবনার ঢেউ আছড়ে পড়ছে।
‎
‎দিনের শুরুতে “Advances in Pet Animal Medicine, Diagnostics and Vaccination” সেশনে বসে মনে হলো, পোষা প্রাণীর চিকিৎসা আর আগের সেই সীমিত ধারণার মধ্যে নেই। রোগ হলো, ওষুধ দিয়ে দিলাম—ব্যাপারটা যেন তার চেয়ে অনেক বড় হয়ে উঠেছে। আধুনিক ও দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, টিকাদান, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স—প্রতিটি বিষয়ই আজকের চিকিৎসাবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বক্তাদের উপস্থাপনা ও অংশগ্রহণকারীদের প্রশ্নোত্তরের মধ্যে বারবার ফিরে আসছিল একটি বিষয়,প্রাণী চিকিৎসাকে আরও বিজ্ঞানভিত্তিক ও দায়িত্বশীল করতে হবে।
‎
‎এক সেশন শেষে আবারও আরেক সেশন শুরু হয়।
‎
‎“Innovations in Anesthesia, Surgery and Specialized Critical Care of Pets”—নামটিই যেন বলে দেয়, আলোচনার পরিধি কতটা বিস্তৃত।
‎
‎অ্যানেসথেশিয়া থেকে সার্জারি, অর্থোপেডিক চিকিৎসা থেকে ক্রিটিক্যাল কেয়ার—পোষা প্রাণীর চিকিৎসায় বিশেষায়িত সেবার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা চলতে থাকে। আমি চারপাশে কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে থাকি আর ভাবি—এই সম্মেলনে আমরা শুধু অন্যদের কথা শুনতেই আসিনি; নিজেদের কাজ, গবেষণা ও অভিজ্ঞতাও ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছি।
‎
‎আর সেই ভাবনার মধ্যেই মনে পড়ে যায়, দুপুরের মধ্যাহ্নভোজনের পরই আমার নিজের উপস্থাপনা।
‎মনের ভেতর হঠাৎ অন্যরকম এক অনুভূতি তৈরি হলো। এতক্ষণ পর্যন্ত আমি ছিলাম একজন শ্রোতা—অন্যদের গবেষণা শুনছি, নতুন নতুন তথ্য জানছি। এবার আমাকে দাঁড়াতে হবে সেই একই মঞ্চে, যেখানে কিছুক্ষণ আগেও দেশের অভিজ্ঞ ভেটেরিনারিয়ানরা তাঁদের গবেষণা ও চিকিৎসা-অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন।
‎
‎দুপুরের খাবার শেষ করে যখন উপস্থাপনার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, মনে হলো–বাইরে তখনও নিজের ছন্দে ছুটে চলছে সৈকতনগরী কক্সবাজার। সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে তীরে, পর্যটকদের কোলাহল, নোনা জলের বাতাসে মিশে চলছে শহরের চেনা ব্যস্ততা। অথচ আমার ভেতরে তখন এক অন্যরকম নীরবত–সঙ্গে চাপা উত্তেজনা।
‎
‎সামনে গবেষণা উপস্থাপনের মুহূর্ত। হাতে সাজানো স্লাইড, মাথায় ঘুরছে গবেষণার তথ্য, ফলাফল আর সম্ভাব্য প্রশ্ন। কয়েক মিনিট পরই এই বৈজ্ঞানিক সম্মেলনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে কয়েকদিনের গোছানো কাজ তুলে ধরতে হবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভেটেরিনারিয়ান ও বিশেষজ্ঞদের সামনে।
‎
‎চাপা উত্তেজনার মধ্যেই নিজের উপস্থাপনা শেষ হলো। প্রশ্ন এলো। আলোচনা হলো। কয়েক মিনিটের সেই সময়টুকু যেন মুহূর্তেই কেটে গেল।
‎
‎মঞ্চ থেকে নেমে যখন আবার শ্রোতাদের সারিতে ফিরে এলাম, তখন মনে হলো—একটি বৈজ্ঞানিক সম্মেলনের সবচেয়ে সুন্দর দিক সম্ভবত এখানেই। এখানে কেউ শুধু নিজের কথা বলতে আসে না; অন্যের কথা শুনেও নিজের কাজকে নতুন করে দেখতে শেখে।
‎
‎দিনের শেষে আবার যখন সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছি, মনে হলো–গত রাতের সেই ঢেউগুলো আজও একইভাবে ফিরে আসছে। শুধু আমার দেখার চোখটা বদলে গেছে। বিস্তীর্ণ নীল জলরাশির সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ছোট্ট জীবনটাকে যেন নতুন করে দেখছি। এই বিশাল সমুদ্রের কাছে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, আমাদের প্রতিটি অর্জন, ব্যস্ততা আর দুশ্চিন্তা কতটা ক্ষুদ্র–তবু সেই ক্ষুদ্র জীবনেই কত স্বপ্ন, কত দায়িত্ব, কত না-বলা গল্প।

(আগামীকাল শেষ পর্ব……)

‎

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *