ডা: মোছা: ফাহমিদা সুলতানা জোনাকী:
ঈদ মানেই আনন্দ, ব্যস্ততা, ভ্রমণ, অতিথি আপ্যায়ন আর পরিবার-পরিজনদের সাথে সময় কাটানোর বিশেষ আয়োজন। বছরের এই দীর্ঘ ছুটিতে অনেকেই গ্রামের বাড়িতে যান, কেউবা শহরের বাইরে বের হন। কিন্তু উৎসবের এই আনন্দঘন সময়ে আমাদের ঘরের আরেক সদস্য পোষা প্রাণী- যারা প্রায়ই অবহেলার শিকার হয়। অথচ মানুষের মতো তারাও অভ্যাস, নিরাপত্তা ও যত্নের উপর নির্ভরশীল। তাই ঈদের আনন্দ যেন তাদের কষ্টের কারণ না হয় সে দায়িত্ব আমাদেরই।
যেসব বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি: হঠাৎ পরিবর্তন পোষা প্রাণীর জন্য চাপের কারণ-
পোষা প্রাণী বিশেষ করে বিড়াল ও কুকুর নির্দিষ্ট রুটিনে অভ্যস্ত থাকে। নির্দিষ্ট সময়ে খাবার,হাঁটা, খেলাধুলা কিংবা ঘুম-এসবে সামান্য পরিবর্তনও তাদের মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। ঈদের সময়ে ঘরে অতিথির ভিড়,শব্দ,রান্নাবান্নার ব্যস্ততা বা আতশবাজির আওয়াজ প্রাণীদের ভীত ও অস্থির করে তোলে। অনেক প্রাণী তখন খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেয় বা তাদের আচরণে পরিবর্তন দেখা যায়। তাই উৎসবের মাঝেও তাদের দৈনন্দিন রুটিন যতটা সম্ভব অপরিবর্তিত রাখা জরুরি। নিয়মিত খাবার দেওয়া, পরিচিত জায়গায় বিশ্রামের ব্যবস্থা রাখা এবং অতিরিক্ত শব্দ থেকে দূরে রাখাই হবে প্রথম যত্ন।
ভ্রমণে গেলে কি করবেন-
ঈদের ছুটিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-পোষা প্রাণীকে সঙ্গে নেওয়া হবে নাকি বাসায় রেখে যাওয়া হবে? সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন, পরিকল্পনা থাকতে হবে আগে থেকেই।
যদি সঙ্গে নিয়ে যান তবে- ভ্রমণের আগে ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ভ্রমনের সময় এমন ক্যারিং ব্যাগ বা ঝুড়ি ব্যবহার করতে হয় যাতে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল (ভেন্টিলেশন) স্বাভাবিক থাকে।
প্রয়োজনীয় টিকা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।পর্যাপ্ত খাবার, পানির পাত্র, পরিচিত খেলনা ও বিছানা সঙ্গে রাখতে হবে।
দীর্ঘ যাত্রায় বিরতি দিয়ে প্রাণীকে স্বস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
দূরপাল্লার যাত্রায় পোষা প্রাণীর স্বস্তি ও পরিচ্ছন্নতার কথা বিবেচনা করে সঙ্গে লিটার বক্স রাখা উত্তম।
আর যদি বাসায় রেখে যান-
দায়িত্বশীল কোনো পরিচিত ব্যক্তি বা পেট কেয়ার সেবার ব্যবস্থা করতে হবে।
পর্যাপ্ত খাবার ও পরিষ্কার পানির ব্যবস্থা রাখতে হবে।
প্রাণীর যেকোনো জরুরি চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য লিখে যেতে হবে।
প্রাণীর বিশেষ স্বভাব বা আচরণ পরিচিত ব্যক্তি বা পেট কেয়ার সেবা প্রদানকারীকে জানিয়ে যেতে হবে।
অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে একা থাকলে প্রাণীরা বিষণ্ণতায় ভোগে। তাই শুধু খাবার দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না বরং তাদের সাথে সময় কাটানোর মানুষও প্রয়োজন।
খাবার নিয়ে বাড়তি সতর্কতা-
ঈদের সময় ঘরে নানা রকমের খাবার থাকে- মিষ্টি, চকলেট, মাংস,হাড়সহ বিভিন্ন পদের রান্না ইত্যাদি। এগুলোর অনেক কিছুই পোষা প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর। অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার, মসলাযুক্ত রান্না বা চকলেট আপনার পোষা প্রাণীর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। অতিথিরা আদর করে খাবার দিতে চাইলে বিনয়ের সঙ্গে তাদের সচেতন করা প্রয়োজন। কারণ একবার ভুল খাবার খেলে হজমের সমস্যা থেকে শুরু করে গুরুতর অসুস্থতা পর্যন্ত হতে পারে।
স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা-
উৎসবের ব্যস্ততায় অনেক সময় গোসল, পরিচর্য়া বা নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি উপেক্ষিত থাকে। অথচ ভ্যাপসা গরম আবহাওয়ায় পোষা প্রাণীর ত্বক ও লোমের যত্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিষ্কার পানি, আরামদায়ক ঘুমের জায়গা এবং নিয়মিত পরিচর্যা তাদের সুস্থ রাখে। এছাড়া জরুরি প্রয়োজনে ভেটেরিনারিয়ানদের যোগাযোগ নম্বর হাতের কাছে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।
সহমর্মিতার শিক্ষা-
ঈদের মূল শিক্ষা হলো ত্যাগ, সহমর্মিতা ও মানবিকতা। এই মূল্যবোধ শুধু মানুষের জন্য নয়; আমাদের আশেপাশের সব প্রাণীর প্রতিও সমানভাবে প্রযোজ্য। পোষা প্রাণী আমাদের আনন্দ দেয়, সঙ্গ ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দেয়-তাই উৎসবের দিনগুলোতে তাদের নিরাপত্তা ও স্বস্তি নিশ্চিত করাও আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।