জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: খামারিদের প্রত্যাশা, প্রাপ্তি এবং বাস্তবতা

আষাঢ়ের ঝুম বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে উদ্বিগ্ন মুখে বাকৃবির ভেটেরিনারি টিচিং হাসপাতালে এসেছেন আকলিমা বেগম। তার কোলে ছিল শখের ছাগল ’চাঁদনী’। কয়েকদিন ধরেই চাঁদনী ঠিকমতো খাবার খেতে পারছে না। শ্বাসকষ্টে নিস্তেজ হয়ে পড়েছে শরীর। একটা প্রাণীর অসুস্থতা যতটা না কষ্টের, তার চেয়ে বড় ছিল আকলিমা বেগমের অনিশ্চয়তা। তিনি জানেন চিকিৎসা করাতে খরচ হবে। কিন্তু সেই খরচের চেয়েও বড় ভয়-চাঁদনীকে যদি বাঁচানো না যায়? কারণ এই ছাগলটি শুধু তার শখ নয়; এটি তার সংসারের  আয়ের অন্যতম উৎস। চাঁদনীর পেছনে বছরেরে পর বছর খাদ্য, পরিচর্যা ও চিকিৎসায় যে অর্থ তিনি ব্যয় করেছেন, সেটিই তার ক্ষুদ্র পুঁজি। একটি প্রাণী হারানো মানে তার কাছে শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, ভবিষ্যতের স্বপ্নও হারিয়ে যাওয়া।

আকলিমা বেগম একা নন, দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে এমন অসংখ্য ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় খামারি। কেউ শখের বশে দু- একটি গরু,ছাগল অথবা ভেড়া পালন করেন। কেউ আবার শত শত কোটি টাকার বাণিজ্যিক খামার পরিচালনা করেন। কারও পুঁজি সীমিত,কারও বিনিয়োগ বিশাল; কিন্তু সবার উদ্বেগ এক জায়গায় গিয়ে মিলে-খামার টিকিয়ে রাখা এবং ন্যায্য লাভ নিশ্চিত করা।

প্রতি বছর জাতীয় বাজেট ঘোষণার সময় তাই খামারিদের চোখ থাকে টেলিভিশনের পর্দায়, মোবাইল ফোনের সংবাদে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। কারণ বাজেটের প্রতিটি ঘোষণা তাদের ভবিষ্যৎ আয়-ব্যয়, উৎপাদন খরচ, ওষুধের দাম, পশুখাদ্যের মূল্য, ঋণের সুযোগ এবং বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে সরাসরি প্রভাবিত করে।  

এবারের ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে জাতীয় বাজেটের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এ বাজেটে মৎস ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য ২ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অথচ ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৩ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বরাদ্দ ৬১৮ কোটি টাকা বা প্রায় ১৮.৫ শতাংশ কমেছে। মন্ত্রণালয়ের মোট বরাদ্দের মধ্যে প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য ১ হাজার ১১৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকা নির্দিষ্টভাবে বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

যদিও সামগ্রিক বরাদ্দ কমেছে, তবুও এবারের বাজেটে প্রাণিসম্পদ খাতের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, দেশীয় শিল্পের বিকাশ এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কর- সুবিধা ও নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো পোলট্রিু ও ডেইরি ফিড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি শুল্ক সুবিধা বহাল ও সম্প্রসারণ। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পশুখাদ্য উৎপাদনেরে ব্যয় হ্রাস পেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে খামারিদের উৎপাদর খরচ কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

এছাড়াও অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (API) উৎপাদনের জন্য বিদ্যমান রেয়াতি সুবিধার আওতায় নতুন কয়েকটি কাঁচামাল অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে দেশীয় ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল সংগ্রহ সহজ হবে, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে এবং আমদানি নির্ভরতা কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে। একইসঙ্গে ভেটেরিনারি ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে নতুন Raw Material অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে দেশীয় ভেটেরিনারি ওষুধ শি্ল্প আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে, উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং খামারিদের তুলনামূ্লকভাবে সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত ভেটেরিনারি ওষুধ প্রাপ্তির সুযোগ সৃষ্টি হবে।

প্রাণিসম্পদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে এবারের বাজেটে দেশীয় ভেটেরিনারি ভ্যাক্সিন উৎপাদন ও সম্প্রসারণের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (BLRI) উদ্ভাবিত Avian Influenza এবং গোট পক্স (ছাগলের বসন্ত) ভ্যাক্সিন মাঠ পর্যায়ে সরবরাহ ও ব্যবহার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভ্যাক্সিন উৎপাদন, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়নের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রাণিসম্পদের সংক্রমক রোগ নিয়ন্ত্রণে দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, আমদানি নির্ভরতা কমবে এবং খামারিদের আর্থিক ঝুঁকি অনেকটাই হ্রাস পাবে।

এছাড়াও সরকার খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। এ লক্ষ্যে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষক ও খামারিদের বিভিন্ন সরকারি সহায়তা ও ভর্তুকি কার্যক্রমের আওতায় আনার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে খামারিদের সহজ শর্তে ঋণ, আর্থিক সেবা এবং প্রণোদনা প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণের প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে।

বাজেটে কৃত্রিম প্রজনন, জাত উন্নয়ন, প্রাণিসম্পদ সেবা সম্প্রসারণ এবং উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে চলমান প্রকল্পগুলো অব্যাহত রাখার উদ্যোগ ইতিবাচক। এসব কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়ক হবে। তবে বাস্তবতা হলো খামারিরা বর্তমানে বহুবিধ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তারা কিছুক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সহায়তা দাবি করে। দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ হলেও স্বল্পমেয়াদি সংকট মোকাবেলার ব্যবস্থা না থাকলে অনেক ক্ষুদ্র খামারি উৎপাদন থেকে ছিটকে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।

বিশেষ করে এবারের বাজেটে খামারিদের বড় প্রত্যাশা ছিল পশুখাদ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা আনা। দেশে গবাদিপশু ও পোলট্রি খামারের সবচেয়ে বড় ব্যয় খাদ্য। ভুট্টা, সয়াবিন মিল, গমের ভূষি ও অন্যান্য উপকরণের দাম আন্তর্জাতিক বাজার এবং আমদানি ব্যয়ের কারণে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু বাজেটে এই খাতের জন্য কোনো বিশেষ ভর্তুকি বা মূল্য সহায়তা কর্মসূচির সুস্পষ্ট ঘোষণা না থাকায় খামারিদের মধ্যে কিছুটা হতাশা রয়েছে।

এক্‌ইভাবে প্রাণিসম্পদ বীমা ব্যবস্থার প্রসার নিয়েও বাজেটে বড় ধরণের কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি। বাংলাদেশে এখনও অধিকাংশ খামারি প্রাকৃতিক দুর্যোগ,মহামারি বা আকস্মিক রোগব্যধির কারণে ক্ষতির ঝুঁকিতে থাকেন। একটি রোগের প্রাদুর্ভাব বা বন্যার কারণে বহু খামার ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। উন্নত দেশগুলোতে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ বীমা খামারিদের সুরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলেও বাংলাদেশে এই ব্যবস্থা এখনও সীমিত পর্যায়ে আছে। বাজেটে এই খাতে বিশেষ বরাদ্দ বা বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা থাকলে তা খামারিদের জন্য আশার বার্তা হতে পারতো।

আকলিমা বেগমের মতো দেশের লাখো ক্ষুদ্র খামারির প্রত্যাশা ছিল ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে প্রাণিসম্পদ খাত আরও বেশি গুরুত্ব পাবে। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশুখাদ্যের কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি,ওষুধ ও ভ্যাক্সিনের বাড়তি দাম, উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং বাজারের অস্থিরতা তাদের মুনাফাকে উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত করেছে। এমন বাস্তবতায় এবারের বাজেট ছিল খামারিদের জন্য নতুন আশা ও সম্ভাবনার প্রতীক। বাজেটের বরাদ্দ, নীতিগত অগ্রাধিকার এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা বিবেচনায় নিলে সেই প্রত্যাশা কতটা পূরণ হবে, সেটিই এখন আলোচনার বড় বিষয়। ‍

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *