ডাঃ ফাহমিদা সুলতানা জোনাকী:
টেলিভিশনের পর্দায় তখন নাম ঘোষণার পালা। হলভর্তি মানুষের বিস্মিত চোখ তখন পর্দায়। একে একে দেশের গুণী শিক্ষকদের নাম ঘোষণা হচ্ছে। উপস্থিত সবাই অপেক্ষায় আরো কয়েকটি নাম শোনার জন্য। কিন্তু কোথাও যেন অপেক্ষাটা একটু বেশি দীর্ঘ মনে হচ্ছিল কিছু শিক্ষার্থীর কাছে। কারণ, তারা অপেক্ষা করছিল তাদের প্রিয় শিক্ষকের নামটি শোনার জন্য।
অধীর আগ্রহে মোবাইলের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের চোখে তখন অন্যরকম এক উচ্ছ্বাস। কখন ঘোষিত হবে পরিচিত সেই নাম–প্রফেসর ড. মোঃ বাহানুর রহমান? কখন তাঁদের প্রিয় শিক্ষক উঠে দাঁড়াবেন? কখন দেশের গুণী শিক্ষকদের তালিকায় তাঁর নাম উচ্চারিত হবে? আর কখন তিনি প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে গ্রহণ করবেন সেই কাঙ্ক্ষিত সম্মাননা?
অবশেষে সেই প্রতীক্ষার অবসান হলো।পর্দায় ভেসে উঠল তাঁর নাম। মুহূর্তেই যেন আনন্দের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল শিক্ষার্থীদের মাঝে। কারও চোখে গর্ব, কারও মুখে হাসি, কারও মনে ফিরে এলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই দিনগুলোর অসংখ্য স্মৃতি। একজন শিক্ষক রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত হচ্ছেন কিন্তু তাঁর শিক্ষার্থীদের কাছে এ যেন নিজেদেরই একটি অর্জন।
কেননা অধ্যাপক ড. মোঃ বাহানুর রহমান তাঁদের কাছে শুধু একজন অধ্যাপক নন। তিনি একজন শিক্ষক, একজন পথপ্রদর্শক, একজন অভিভাবক। তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের গল্প।প্রথম ক্লাসের স্মৃতি, গবেষণাগারের ব্যস্ততা, কঠিন সময়ে পাওয়া পরামর্শ, ভুল থেকে শেখার সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস।
একজন শিক্ষকের জীবনে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। কিন্তু এই সম্মাননার পেছনে যে দীর্ঘ পথচলা, অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষার্থী গড়ে তোলার যে নীরব সাধনা–সেই গল্পটি আরও গভীর, আরও বিস্তৃত।
অধ্যাপক ড. মোঃ বাহানুর রহমানের গল্প তাই কেবল একজন গুণী শিক্ষকের সম্মাননা পাওয়ার গল্প নয়; এটি একজন শিক্ষকের দীর্ঘ সাধনা, গবেষণার প্রতি দায়বদ্ধতা, শিক্ষার্থীদের প্রতি মমতা এবং একজন আদর্শ শিক্ষক হয়ে ওঠার গল্প।
সম্মাননার মঞ্চে সেদিন হয়তো তাঁর গলায় উঠেছিল একটি মেডেল। কিন্তু সেই মুহূর্তে তাঁর সঙ্গে সম্মানিত হয়েছিল তাঁর অসংখ্য শিক্ষার্থী, সহকর্মী, তাঁর প্রতিষ্ঠান এবং দেশের ভেটেরিনারি শিক্ষা ও গবেষণার একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য।
সেই মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে, একটু পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয় প্রফেসর ড. মোঃ বাহানুর রহমান স্যারের এই সম্মাননা যেন হঠাৎ পাওয়া কোনো স্বীকৃতি নয় বরং বহু বছরের শিক্ষকতা, গবেষণা, নিষ্ঠা ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার একটি পরিণত অধ্যায়।
একজন শিক্ষকের কতগুলো গবেষণাপত্র আছে, কতগুলো পুরস্কার আছে–এসব দিয়ে তাঁর সাফল্যের একটি অংশ মাপা যায়। কিন্তু একজন শিক্ষক কতজন শিক্ষার্থীর জীবনকে ইতিবাচকভাবে বদলে দিতে পেরেছে, তার হিসাব কোনো সংখ্যায় পাওয়া যায় না।আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা তাঁর সাবেক শিক্ষার্থীদের দিকে তাকালে সেই অদৃশ্য সাফল্যের কিছুটা দেখা যায়।কেউ চিকিৎসক, কেউ গবেষক, কেউ শিক্ষক, কেউ প্রশাসক। কেউ দেশের বাইরে নিজের কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। তাঁদের প্রত্যেকের পথ আলাদা, কিন্তু কোথাও না কোথাও তাঁদের শিক্ষাজীবনের গল্পে একজন ‘বাহানুর স্যার’ আছেন।
রাষ্ট্র তাঁকে গুণী শিক্ষক হিসেবে সম্মানিত করেছে,এটি তাঁর দীর্ঘ সাধনার স্বীকৃতি। কিন্তু শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে তিনি যে জায়গাটি তৈরি করেছেন, সেটি কোনো পুরস্কার দিয়ে মাপা সম্ভব নয়।