হাবিপ্রবি শিক্ষার্থী নাহিদের AI উদ্ভাবন, মাটির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেবে উপযোগী ফসলের পরামর্শ

হাবিপ্রবি প্রতিনিধি:

হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২৩ ব্যাচের শিক্ষার্থী নাহিদ ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে সংগ্রহ করা ২৮ ধরনের ফসলের মাটির বাস্তব ডেটার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করেছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) নির্ভর একটি ফসল সুপারিশ ব্যবস্থা। Machine Learning (ML) Pipeline, নিজস্ব Large Language Model (LLM) Chatbot এবং Android অ্যাপ সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই প্রযুক্তি মাটির pH, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, আর্দ্রতা, তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের তথ্য বিশ্লেষণ করে কৃষককে সবচেয়ে উপযোগী ফসলের পরামর্শ দেয়। পাশাপাশি বাংলায় কৃষকের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরও দিতে সক্ষম এই AI-ভিত্তিক চ্যাটবট। সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (BADC) দিনাজপুর নার্সারি মাঠে সফল পরীক্ষামূলক প্রয়োগের পর প্রযুক্তিটি এখন পূর্ণাঙ্গ ব্যবহারের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে।

গবেষণার গল্পটা শুরু হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকেই। অধিকাংশ গবেষণায় যেখানে প্রস্তুত ডেটাসেট ব্যবহার করা হয়, সেখানে নাহিদ ইসলাম ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি নিজেই হাবিপ্রবি ক্যাম্পাস এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকে মাটির নমুনা সংগ্রহ করেন। ২৮ ধরনের ফসলের জন্য আলাদাভাবে মাটির বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করেন এবং সেই বাস্তব তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি করেন সম্পূর্ণ Machine Learning Pipeline।

মাটি বিশ্লেষণের জন্য তিনি pH, নাইট্রোজেন (N), ফসফরাস (P), পটাশিয়াম (K), আর্দ্রতা, তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিপাতের তথ্য সংগ্রহ করেন। এরপর ডেটা প্রিপ্রসেসিং, ফিচার ইঞ্জিনিয়ারিং, মডেল ট্রেনিং ও ভ্যালিডেশনের মাধ্যমে তৈরি করেন একটি AI মডেল, যা টেস্ট ডেটাসেটে ৯৭ শতাংশের বেশি নির্ভুলতা অর্জন করেছে।

তবে এই গবেষণা কেবল একটি AI মডেল তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাস্তবে কৃষকের হাতে সহজে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে তিনি পুরো প্রযুক্তিটিকে চারটি স্তরে সাজিয়েছেন।

প্রথম স্তরে রয়েছে IoT-ভিত্তিক Soil Analyzer। মাঠেই এই ডিভাইস মাটির pH, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা পরিমাপ করে সরাসরি ক্লাউডে পাঠায়। ফলে ল্যাবে নমুনা নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না এবং অল্প সময়েই মাটির অবস্থা জানা যায়।

দ্বিতীয় স্তরে কাজ করে AI Crop Recommendation Engine। ক্যাম্পাস থেকে সংগ্রহ করা বাস্তব ডেটায় প্রশিক্ষিত Machine Learning মডেল জমির বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে ২৮টি সম্ভাব্য ফসলের মধ্য থেকে সবচেয়ে উপযোগী ফসল নির্বাচন করে দেয়। পরীক্ষায় এই মডেলের নির্ভুলতা ৯৭ শতাংশেরও বেশি।

তৃতীয় স্তরে রয়েছে গবেষকের নিজস্ব তৈরি LLM Chatbot। কৃষক বাংলায় প্রশ্ন করলেই এটি তাৎক্ষণিক উত্তর দিতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই চ্যাটবট পরিচালনার জন্য কোনো তৃতীয় পক্ষের ব্যয়বহুল AI API-এর ওপর নির্ভর করতে হয় না। ফলে প্রযুক্তিটি আরও সাশ্রয়ী ও দেশীয় সমাধান হিসেবে গড়ে উঠেছে।

সবশেষে রয়েছে একটি Android APK, যা সাধারণ স্মার্টফোনেই ব্যবহার করা যায়। বিশেষ কোনো হার্ডওয়্যার ছাড়াই কৃষক প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে মুহূর্তেই ফসলের সুপারিশ পেতে পারেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকদের কাছেও স্বল্প খরচে এই প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়াই এর মূল লক্ষ্য।

ল্যাবে তৈরি প্রযুক্তি বাস্তবে কতটা কার্যকর, সেটি যাচাই করতেই সম্প্রতি দিনাজপুরের বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (BADC) নার্সারি মাঠে পরিচালিত হয় মাঠ পরীক্ষা। সেখানে গবেষক নাহিদ ইসলাম নিজেই IoT Soil Analyzer ডিভাইস স্থাপন করে রিয়েল-টাইমে মাটির তথ্য সংগ্রহ করেন এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে AI কীভাবে তাৎক্ষণিকভাবে ফসল নির্বাচন করে, পুরো প্রক্রিয়াটি প্রদর্শন করেন।

এই গবেষণার একাডেমিক তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন হাবিপ্রবি ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. দুলাল হক। মাঠপর্যায়ে গবেষণাটির বাস্তবায়নে সহায়তা করেন BADC দিনাজপুরের কৃষিবিদ শাহানা পারভীন। 

এ বিষয়ে গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক দুলাল হাসান বলেন,“নাহিদ শুধু একটি মডেল তৈরি করেনি, সে ক্যাম্পাস থেকে নিজে ডেটা সংগ্রহ করে পুরো পাইপলাইন দাঁড় করিয়েছে। একজন শিক্ষক হিসেবে এটা দেখে সত্যিই গর্ব হয়। এই সিস্টেমটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কৃষকদের জন্য বাস্তবসম্মত একটি সমাধান।”

কৃষিবিদ শাহানা পারভীন বলেন, “মাঠে এসে যখন দেখলাম মাটিতে সেন্সর বসিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ফসলের সুপারিশ আসছে, সেটা আমার কাছে সত্যিই চমকপ্রদ ছিল। আমরা BADC থেকে কৃষকদের পরামর্শ দিই, কিন্তু এই ধরনের প্রযুক্তি থাকলে আমাদের কাজ আরও দ্রুত ও নির্ভুল হবে।”

উদ্ভাবক নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমার লক্ষ্য ছিল এমন একটি সিস্টেম তৈরি করা যা সত্যিকার অর্থে মাঠপর্যায়ে কাজ করবে। ভবিষ্যতে আমরা আরও বেশি জেলার মাটির ডেটা যুক্ত করে মডেলকে আরও শক্তিশালী করতে চাই এবং SMS-এর মাধ্যমে ইন্টারনেট ছাড়াও যেন কৃষক সেবা পেতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে।”

IoT, এমবেডেড সিস্টেম ও মেশিন লার্নিং নিয়ে কাজ করা নাহিদ ইসলামের এটি প্রথম উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নয়। এর আগে একাধিক প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের জন্য AI-ভিত্তিক সিস্টেম তৈরি করেছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে নিজ হাতে সংগৃহীত বাস্তব মাটির ডেটার ওপর ভিত্তি করে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে নির্মিত এই কৃষি সমাধান তাঁর গবেষণাকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *