ঈদে শিক্ষার্থীরা বাড়ি ফেরায় সংকটে বাকৃবি ক্যাম্পাসনির্ভর ব্যবসায়ীরা

বাকৃবি বিশেষ সংবাদদাতা:

ঈদের ছুটি শুরু হলেই বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) ক্যাম্পাসে নেমে আসে ভিন্ন এক চিত্র। শিক্ষার্থীদের কোলাহল থেমে গিয়ে ফাঁকা হয়ে পড়ে হল, টিএসসি, জব্বার মোড় ও আশপাশের ব্যস্ত এলাকাগুলো। আর এই নীরবতার সরাসরি প্রভাব পড়ে ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কর্মজীবী মানুষের জীবিকায়। চায়ের দোকান, হোটেল, ফটোকপি স্টল, রিকশা কিংবা অটোরিকশা চালকদের আয় হঠাৎ করেই কমে যায়। অন্যদের জন্য ঈদ আনন্দের উপলক্ষ হলেও তাদের অনেকের কাছে এটি হয়ে ওঠে অনিশ্চয়তা আর টিকে থাকার সংগ্রামের সময়।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় অসংখ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির ওপর নির্ভর করেই চলে চা দোকান, খাবারের হোটেল, ফটোকপি ও প্রিন্টিং দোকান, ভ্যানচালক, রিক্সাচালকসহ অনেক মানুষের জীবিকা। কিন্তু ঈদের দীর্ঘ ছুটি শুরু হলেই অধিকাংশ শিক্ষার্থী বাড়ি ফিরে যাওয়ায় ক্যাম্পাসে নেমে আসে নীরবতা। এতে আয় কমে যায় এসব কর্মজীবী মানুষের।

বাকৃবির মিলন হোটেলের মালিক মিলন বলেন, ঈদের ছুটিতে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হলে দোকানও বন্ধ রাখতে হয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যাওয়ায় বিক্রি অনেক কমে যায়, তাই লসের চেয়ে দোকান বন্ধ রাখাই ভালো মনে করি। তবে দোকান বন্ধ থাকলেও স্টাফদের বেতন, বোনাস ও অগ্রিম টাকা দিতে হয়। অনেক কর্মচারী ২ হাজার, ৫ হাজার বা ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অগ্রিম চান, যা ব্যবসার স্বার্থে দিতে বাধ্য হই। তখন হাতে টাকা না থাকায় বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়। পরে দোকান খোলার পর ধীরে ধীরে ব্যবসা করে সেই ঋণ পরিশোধ করি। ঈদের মতো বড় ছুটিতে ক্ষতি কম নয়, মোটামুটি ভালোই ক্ষতি হয়। তবুও কোনো রকমে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছি। লাভ ক্ষতি মিলিয়েই জীবন চলছে।

বাকৃবির জাহিদ এন্টারপ্রাইজ দোকানের মালিক মো. মামুন বলেন, বর্তমানে তার দৈনিক আয় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে হলেও ঈদের লম্বা ছুটির সময় তা নেমে আসে ১০০ থেকে ১৫০ টাকায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট লোকজন না থাকলে এলাকায় তেমন মানুষের উপস্থিতি থাকে না। বাইরের কেবল দুই-একজন মানুষ আসেন। ফলে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকলে ব্যবসা পরিচালনা করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে।

তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীরা না থাকলে ক্যাম্পাস একেবারে ফাঁকা হয়ে যায়। তখন মাঝে মাঝে দোকান খোলা রাখি, আবার কখনো বন্ধ করে চলে যাই।কারণ ফাঁকা ক্যাম্পাসে দীর্ঘ সময় অবস্থান করতেও ভালো লাগে না। অন্যান্য জায়গার মতো ঈদের সময় ক্যাম্পাস এলাকায় বেচাকেনা বাড়ে না, বরং শিক্ষার্থীরা বাড়ি চলে যাওয়ায় বিক্রি কমে যায়। ঈদের দিন দোকান বন্ধ রাখি। এর দুই-তিন দিন পর দোকান খুললেও তেমন লাভ হয় না, কারণ তখনও অধিকাংশ শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে ফেরে না। তবে সাধারণত ঈদের পরের দিন থেকে কিছু দর্শনার্থী ক্যাম্পাসে ঘুরতে আসেন। রোজার ঈদের সময় দুপুর পর্যন্ত লোকজনের উপস্থিতি কম থাকে। তবে কোরবানির দিন বিকেলের দিকে কিছু মানুষের আনাগোনা বাড়ে। এছাড়া কোরবানির পর ঢাকা ও অন্যান্য এলাকা থেকে অনেকে ক্যাম্পাসে এসে ঘুরে যান এবং খোলা পরিবেশে সময় কাটান, তখন বিক্রি কিছুটা বাড়ে।

ক্যাম্পাসের ফটোকপি দোকানের মালিক মো. জসিম বলেন, “ক্যাম্পাসে যখন ছুটিতে সবাই চলে যায়, তখন দোকানে বসে নাটক দেখা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।”

তিনি জানান, বর্তমানে ক্যাম্পাস খোলা থাকলেও প্রতিদিন মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার বিক্রি হয়। ছুটি শুরু হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায়।ক্যাম্পাস বন্ধ হয়ে গেলে তো আর লোকজন থাকবে না। তখন কী অবস্থা হয় বুঝতেই পারেন।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের অটোরিকশা চালক মোমেন মিয়ার সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরাই আমার জীবিকা উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম। তারা ঈদের ছুটিতে চলে যাবার পর রিকশা চালানো বন্ধ রাখতে হবে। তবে ঈদের সময় ক্যাম্পাসে প্রচুর পরিমাণে দর্শনার্থী ঘুরতে আসায় তখন কিছু উপার্জনের আশা রয়েছে। 

তবে দীর্ঘ ছুটি শেষে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ফিরলেই আবার প্রাণ ফিরে পায় বাকৃবি। জমে ওঠে দোকানপাট, বাড়ে বিক্রি, ফিরে আসে কর্মব্যস্ততা। সেই আশাতেই দিন পার করেন এসব কর্মজীবী মানুষ।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *