নিজস্ব প্রতিবেদক :
প্রচন্ড দারিদ্রতার কাছে মাথানত না করে শুধুমাত্র অদম্য ইচ্ছে শক্তি আর কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবনে যে সফলতার শিখরে পৌঁছা যায় তার জ্বলন্ত প্রমাণ মোঃ শাহার আলী !
হ্যাঁ, বলছিলাম একজন শাহার আলীর কথা ! জীবনে হার না মানার এক রুপকথার গল্প ! প্রচন্ড দারিদ্রতার কাছে মাথানত করে শাহার আলীর মত অসংখ্য প্রতিভা যে কখন কোথায় কালের গর্ভে হারিয়ে যায় তার খোঁজ কেইবা রাখে ? শাহার আলী এখানে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। না তিনি হারিয়ে যান নি, বরং আজন্ম দারিদ্রতার সঙ্গে অসম যুদ্ধ করে জীবনে ঈর্ষনীয় সাফল্য অর্জন করে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন শুধুমাত্র অদম্য ইচ্ছে শক্তি আর কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবনে পাহাড়সম বাঁধাকেও ডিঙ্গিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া যায় !
মোঃ শাহার আলীর বাবা মোঃ ছেফাত উল্লাহ ও মাতা মোছাঃ সালেহা খাতুন । ৬ ভাই আর ১ বোনের বিশাল এক পরিবারে শাহার আলী ছিলেন মা-বাবার তৃতীয় সন্তান। বাবা মোঃ ছেফাত উল্লাহ ছিলেন রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী আর মা ছিলেন গৃহিণী। অনেক গুলো ভাই-বোন আর মা-বাবাকে নিয়ে মোঃ শাহার আলীকে বাস করতে হয়েছিল সরকার প্রদত্ত ধাপ স্টাফ কোয়ার্টারে। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন মোঃ শাহার আলীর বাবা মোঃ ছেফাত উল্লাহ । কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে মোঃ ছেফাত উল্লাহ অত্যান্ত ধর্ম ভীরু ও সৎ হওয়ায় এবং সর্বোপরি একজন ছোট সরকারী চাকুরীজীবী হওয়ায় মোঃ শাহার আলীদের সংসারে সব সময় অভাব-অনটন লেগেই থাকত ।
মোঃ শাহার আলীর শিশুকাল ও বাল্য জীবন ছিলু দুঃখ-দুর্দশার এক অনবদ্য কাব্য-গাঁথা ! চরম দারিদ্রতায় ১৯৮৭ ইং সালে রংপুর শহরের পাশে দোলাপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণীতে অধ্যায়নকালে তাঁর পড়াশোনা থেমেই গিয়েছিল ! বাধ্য হয়ে তাঁকে শিশু শ্রমিক হিসেবে কখনো অন্যের বাড়িতে আর কখনোবা পাউরুটি/বিস্কুট তৈরীর দোকানে কাজ করতে হয়েছিল । তাও আবার কখনো রংপুর শহরে আবার কখনোবা রংপুর শহরের বাইরে ! এজন্য তাঁকে বেশ কিছু দিন রংপুর শহর থেকে ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে গঙ্গাচড়া উপজেলার এক বেকারিতে দিনমজুরের কাজ করতে হয়েছিল ! সেখানে দৈহিক ও মানসিক নির্যাতন তো ছিলই ! তার উপরে বয়স কম হওয়ায় অনভিজ্ঞতা আর প্রচন্ড গরমের কারণে বেকারিতে কাজ করার সময় তাঁর শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ফোসকা পর্যন্ত পরেছিল। এতো কিছুর পরও প্রচন্ড দারিদ্রতা তাঁর পড়াশুনার প্রতি সীমাহীন অদম্য আকাঙ্ক্ষাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি । তিনি সব সময় মনের গহীনে স্বপ্ন বুনতেন কখন তিনি আবার বই নিয়ে স্কুলে যাবেন,পড়তে বসবেন !
কথায় বলে না মানুষ তার স্বপ্নের মধ্যেই বেঁচে থাকে ! দিনমজুর হিসেবে কাজ করার সময় তিনি প্রতিদিন কিছু টাকা জমানো শুরু করলেন । এরই মধ্যে তাঁর জমানো কিছু টাকা দুর্বিপাকে হারিয়ে যায় অথবা চুরি হয়ে যায়। অগত্যা তাঁকে আবার কিছু দিন নতুন করে টাকা জমানোর জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এরপর অনেক কষ্টে ৫০০ টাকা জমানোর পর তিনি আবার ১৯৯১ ইং সালে রংপুরের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্টান রংপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে সরাসরি ৮ম শ্রেণিতে ভর্তি হন। অর্থাৎ ৬ ষ্ট ও ৭ম শ্রেনি না পড়েই সরাসরি ৮ম শ্রেনিতে ! ভাবা যায় ?
এরপর তাঁকে আর ফিরে তাঁকাতে হয়নি । রংপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে ৮ম শ্রেনিতে বৃত্তি, ১৯৯৪ ইং সালে এসএসসি পরীক্ষায় রংপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ঈর্ষণীয় সাফল্য এবং পরবর্তীতে রংপুর ক্যান্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ থেকে বোর্ড স্ট্যান্ড করে এইচএসসি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন । এখানে একটি ঘটনা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, মোঃ শাহার আলী যখন ১৯৯৪ ইং সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ করবেন বলে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন প্রচণ্ড দারিদ্রতার কারনে প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে তাঁর ফরম পূরন (Form fill up) প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। এক পর্যায়ে তিনি পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে বাড়িতে চুপ চাপ বসে রইলেন । এদিকে ফরম পুরনের একেবারে শেষ দিনে মোঃ শাহার আলী ফরম পুরন করছে না বলে জানতে পেরে রংপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সেই সময়ের সিনিয়র শিক্ষক (ইংরেজী) জনাব আবু তৈয়ব মন্ডল তাঁর বাসায় গিয়ে তাঁকে ধরে এনে প্রয়োজনীয় আর্থিক সাহায্য করে তাঁর ফর্ম পুরনের ব্যবস্থা করেন।
যাহোক, মোঃ শাহার আলী পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করে সোজা চলে যান যুক্তরাজ্যের স্কটল্যান্ডে। সেখানে প্রয়োজনীয় উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি সেখানেই নাগরিকত্ব গ্রহণ করে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন । স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো (Glasgow) শহরে রয়েছে তাঁর নিজস্ব বাসা আর কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান । তাঁর সততা ও যোগ্যতায় তিনি সেখনে এখন কমিউনিটি লিডার, রিলিজিয়াস লিডার ও বিজনেস লিডার সহ আরো কতো কি ! একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে স্কটল্যান্ডে রয়েছে তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও পরিচিতি । মোঃ শাহার আলীর ক্ষেত্রে সম্ভবত বিল গেটস্ এর একটি কথা প্রযোজ্য ! বিল গেটস্ বলেছিলেন,” If you are born poor, it’s not your fault. If you die poor, it’s your fault.”
মোঃ শাহার আলী গত ০৭ সেপ্টেম্বের ২০২৬ ইং তারিখে দীর্ঘ দিন পর তাঁর সুখ-দুঃখের স্মৃতি বিজরিত রংপুর উচ্চ বিদ্যালয় দেখতে আসেন । তাঁর এ আগমন উপলক্ষ্যে রংপুর উচ্চ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁর সম্মানে ছাত্রদের জন্য একটি মোটিভেশনাল সেশনের আয়োজন করে। আর এই পুরো সেশনটি মোঃ শাহার আলী পরিচালনা করেন । সেশনটি পরিচালনা করার সময় মোঃ শাহার আলী বিদ্যালয়ের ছাত্রদের কাছে অকপটে তাঁর অতীত জীবনের ঘটে যাওয়া দুখ-বেদনার কাব্য গাঁথা শেয়ার করেন । এ সময় তিনি বিদ্যালয়ের অধ্যয়নরত ছাত্রদের অদম্য ইচ্ছে শক্তি আর কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবনের সমস্ত বাঁধাকে ডিঙ্গিয়ে সফলতার শিখরে পৌঁছার জন্য উৎসাহ প্রদান করেন । এ ছাড়াও তিনি ঘোষণা দেন, যে সকল ছাত্র প্রত্যেক শ্রেণীতে বার্ষিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করবে তাদেরকে তিনি প্রতি বছর আর্থিকভাবে সাহায্য করে পুরস্কৃত করবেন এবং এটা চলমান থাকবে !
রংপুর উচ্চ বিদ্যালয় পরিবার মোঃ শাহার আলীর এই ঘোষণার জন্য কৃতজ্ঞ । রংপুর উচ্চ বিদ্যালয় পরিবার মোঃ শাহার আলীর জন্য গর্বিত ও তাঁর উত্তরোত্তর উন্নতি, সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করছে !