বাকৃবি বিশেষ সংবাদদাতা:
দেশে প্রথমবারের মতো ‘ডান্ডুবিয়া অ্যানানডালেই বুলার্ড’ নামের একটি নতুন প্রজাতির সিকাডা বা ঝিঁঝিঁ পোকার উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন বাংলাদেশ, চীন ও ভারতের গবেষকেরা। মাঠপর্যায়ে নমুনা সংগ্রহ, গঠনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ ও পরিবেশগত তথ্য পর্যালোচনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সাময়িকী ‘ইনসেক্টস’-এ এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণাটি যৌথভাবে পরিচালনা করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবুল মঞ্জুর খান এবং চীনের নর্থওয়েস্ট এ অ্যান্ড এফ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কং ওয়েই। এতে সরাসরি যুক্ত ছিলেন ভারতীয় গবেষক বাবু সাদ্দাম ও বাকৃবির স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী শাহমত জাওয়াদ।
গবেষণার জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আম, লিচু, ড্রাগন ফল, আনারস, কলা, শাল ও সেগুনসহ নানা ফলের বাগান ও বনাঞ্চল থেকে মোট ৬৩টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। জীবিত অবস্থায় ঘাসের মতো সবুজ রঙের এই পোকা শুকিয়ে গেলে বাদামি বর্ণ ধারণ করে। পূর্বে বাংলাদেশে ‘ডান্ডুবিয়া’ গণের কেবল ‘ডান্ডুবিয়া এনসিফেরা’ প্রজাতির নথিভুক্ত উপস্থিতি থাকলেও এবার নতুন এই প্রজাতিটি যুক্ত হলো। পরিবেশগত তথ্য ও ‘ম্যাক্সএন্ট’ মডেল অনুযায়ী, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও ভূমির উচ্চতা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে প্রজাতিটির বসবাস উপযোগী ভৌগোলিক এলাকা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হতে পারে।
ঝিঁঝিঁ পোকাটির উপস্থিতি ও ভবিষ্যৎ গবেষণা প্রসঙ্গে বাকৃবির কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবুল মঞ্জুর খান বলেন, “দেশের বিভিন্ন ফলের বাগানে ঝিঁঝিঁ পোকার উপস্থিতি রয়েছে। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে আম পরিপক্ব হওয়ার সময় গাছের আশপাশে এদের প্রজননকালীন তীব্র শব্দ শোনা যায়। এর মাধ্যমে আমবাগানে ঝিঁঝিঁ পোকার উপস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।”
পাহাড়ি অঞ্চলের বাণিজ্যিক বাগান ও গবেষণা কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, “দেশের পাহাড়ি অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন ফলের চাষ সম্প্রসারিত হচ্ছে। ম্যাক্সএন্ট মডেল অনুযায়ী এসব অঞ্চলের কিছু এলাকা ঝিঁঝিঁ পোকার সম্ভাব্য বিস্তৃতির আওতায় রয়েছে। তবে সেখানকার বাণিজ্যিক ফলবাগানে পোকাটি কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে উদ্যানতাত্ত্বিক ফসলের উৎপাদন ও গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে কি না, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি। শুধু নতুন প্রজাতির উপস্থিতি শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়; এর বিস্তৃতি, জীবনচক্র, খাদ্যাভ্যাস ও কৃষিতে সম্ভাব্য ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণ করাও জরুরি। পোকাটি অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর প্রমাণিত হলে কার্যকর ব্যবস্থাপনা কৌশল উদ্ভাবন করতে হবে।”
দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, “সম্ভাব্য কৃষিঝুঁকি মূল্যায়নে দীর্ঘমেয়াদি মাঠপর্যায়ের গবেষণা অপরিহার্য। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলের বাণিজ্যিক ফলবাগানে প্রজাতিটির উপস্থিতি, ক্ষতির মাত্রা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি নির্ধারণে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং অর্থায়নকারী সংস্থাগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন।”
গবেষকদের মতে, এ ধরনের সহায়তা পেলে ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে কৃষিতে এর প্রকৃত প্রভাব জেনে ভবিষ্যতে সময়োপযোগী ও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে।