বাকৃবিতে জুনিয়র-সিনিয়রদের পাল্টাপাল্টি মারধর, ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে ইন্ধনের অভিযোগ

বাকৃবি প্রতিনিধি:

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) দুই হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি মারধরের অভিযোগ উঠেছে। প্রথম ঘটনায় এক শিক্ষার্থীকে মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ঈশা খাঁ হলের প্রথম বর্ষের আবাসিক শিক্ষার্থী এস.এম. মেরাজুল আনোয়ার সিয়াম। তাঁর অভিযোগ, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের একটি কক্ষে তাঁকে মারধর করেন ওই হলের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী নাজমুল হাসান ইমন। এ ঘটনায় ইন্ধনদাতা হিসেবে ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মেজবাউল হক মিজু ও সোহরাওয়ার্দী হলের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইয়ামিনসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেছেন তিনি। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মিজু। অন্যদিকে, ঘটনার পরদিন সোহরাওয়ার্দী হলের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইয়ামিনকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে ঈশা খাঁ হলের কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে।

সিয়ামের অভিযোগপত্র সূত্রে জানা যায়, গত ৩ নভেম্বর বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে সোহরাওয়ার্দী হলের এ ব্লকের ১০২ নম্বর কক্ষে যান তিনি। সেখানে বন্ধু তাসনিমকে না পেয়ে কক্ষে উপস্থিত পূর্বপরিচিত এক শিক্ষার্থীর আমন্ত্রণে বসেন। কিছুক্ষণ পর একই কক্ষে থাকা ৬৫ ব্যাচের কৃষি অনুষদের শিক্ষার্থী নাজমুল হাসান ইমন তাঁকে বিভিন্ন অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করতে থাকেন। একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়।

সিয়ামের দাবি, একপর্যায়ে ইমন তাঁর ওপর চড়াও হয়ে এলোপাতাড়ি চড়, কিল ও ঘুষি মারেন। এতে তাঁর ডান চোখে গুরুতর আঘাত লাগে এবং চোখের আশপাশে কালশিটে পড়ে। পরে কোনোভাবে কক্ষ থেকে বের হয়ে আসেন তিনি।

অভিযোগপত্রে সিয়াম আরও উল্লেখ করেন, ঘটনার সময় সোহরাওয়ার্দী হলের কয়েকজন শিক্ষার্থী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে হল শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মেজবাউল হক মিজু ও তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইয়ামিনও ছিলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি মীমাংসার প্রস্তাব দেওয়া হলে তাঁকে মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করেন সিয়াম। এ ঘটনায় মিজুর বিরুদ্ধে হামলায় ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগও তোলেন তিনি।

ঘটনার পর নিজ আবাসিক হল ঈশা খাঁ হলে ফিরে সহপাঠী ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীদের বিষয়টি জানান সিয়াম। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন।

এ বিষয়ে অভিযোগকারী শিক্ষার্থী মেরাজুল ইসলাম সিয়াম বলেন, “আমি অভিযোগপত্র জমা দিয়েছি। প্রক্টর স্যার আমাকে পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে দেখা করতে বলেছেন। সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আমি এ বিষয়ে আর কিছু বলতে চাচ্ছি না।”

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সোহরাওয়ার্দী হলের ১০২ নম্বর কক্ষের আবাসিক শিক্ষার্থী মুগ্ধ বলেন, “আমি ওই সময় কক্ষেই উপস্থিত ছিলাম। প্রথমে সিয়াম যখন জানালার সামনে এসেছিল, তখন খেয়াল করিনি। ওই সময় কক্ষে থাকা নাজমুল তাঁর পরিচয় জানতে চায়। কিন্তু সিয়াম কোনো উত্তর দেয়নি। পরে তাকে চিনতে পেরে আমি কক্ষের ভেতরে বসতে বলি। তখনও নাজমুল তার নাম-পরিচয় জানতে চাইছিল, কিন্তু সে উত্তর দিচ্ছিল না। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে তর্কাতর্কি হয় এবং দুজনই একে অপরকে আঘাত করে। নাজমুলের আঘাত সিয়ামের চোখের নিচে লাগে। পরে সে পানি দিতে বাথরুমে যায়। এরপর আমি তাকে ডেকে এনে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করি। কিন্তু সে হলে যাওয়ার কথা বলে চলে যায়।”

এদিকে, প্রথম ঘটনার পরদিন ৪ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দী হলের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইয়ামিনকে মারধরের অভিযোগ ওঠে ঈশা খাঁ হলের কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে।

জানা যায়, ৪ নভেম্বর করিম ভবনে সোহরাওয়ার্দী হলের এক শিক্ষার্থীকে আটক করে রাখা হয়। তাঁকে ছাড়াতে এবং বিষয়টি সমাধানের জন্য সোহরাওয়ার্দী হল থেকে কয়েকজন শিক্ষার্থী সেখানে যান। তাঁদের মধ্যে ইয়ামিনও ছিলেন। পরে করিম ভবনের সামনের একটি হোটেলে দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় ঈশা খাঁ হলের কয়েকজন শিক্ষার্থী এসে তাঁকে মারধর করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় প্রক্টর অফিসে অভিযোগ জানিয়েছেন ইয়ামিন।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ইয়ামিন বলেন, “আগের দিনের কোনো ঘটনা সম্পর্কেই আমি অবগত ছিলাম না। ৪ নভেম্বর হলে ফেরার পথে জানতে পারি, আমাদের হলের এক জুনিয়রকে আটক করা হয়েছে। তাকে ছাড়ানোর জন্যই ঘটনাস্থলে যাই। পরে করিম ভবনের সামনের একটি হোটেলে খেতে গেলে ঈশা খাঁ হলের প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন শিক্ষার্থী সেখানে এসে আমার হলের নাম জানতে চান। আমি সোহরাওয়ার্দী হলের শিক্ষার্থী পরিচয় দেওয়ার পর তাঁরা সবাই মিলে আমাকে এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করেন।”

অভিযোগপত্রে নিজের নাম উল্লেখের বিষয়ে ইয়ামিন বলেন, ঘটনার পরদিন ৫ নভেম্বর তিনি জানতে পারেন, সিয়ামকে মারধরের ঘটনায় ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগে তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ ৩ নভেম্বরের ঘটনার সময় তিনি হলে উপস্থিত ছিলেন না এবং এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না। তাঁর ভাষ্য, “আমাকেই মারধর করে আবার আমার নামেই মারধরের ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।”

অভিযুক্ত নাজমুল হাসান ইমন বলেন, সিয়াম তাঁদের কক্ষে তাসনিমকে খুঁজতে এলে তিনি বারবার তাঁর পরিচয় জানতে চান। কিন্তু সিয়াম পরিচয় না দিয়ে তাঁকে বিভিন্ন উসকানিমূলক মন্তব্য করতে থাকেন। একপর্যায়ে কথা-কাটাকাটির জেরে দুজনের মধ্যে হাতাহাতি হয়।

অভিযোগের বিষয়ে মেজবাউল হক মিজু বলেন, “ঈশা খাঁ হলের ছেলেটি যে সময়ে তাকে মারধর এবং আমাকে সোহরাওয়ার্দী হলে দেখার কথা বলেছে, সে সময় আমি হলে উপস্থিতই ছিলাম না। হলে উচ্চ রেজল্যুশনের সিসি ক্যামেরা রয়েছে। কে কখন হলে প্রবেশ করছে বা বের হচ্ছে, সবই দেখা যায়। ক্যামেরার ফুটেজ দেখলেই বিষয়টি প্রমাণিত হবে।”

সিয়ামকে মারধরের ঘটনায় ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, “ঘটনার পর আমি বিষয়টি জানতে পেরেছি। যাদের মধ্যে মারামারি হয়েছে, তারা কেউই আমার পরিচিত নয়। আমি যতটুকু জানি, মেরাজুলকে যে মারধর করেছে, সে তারই বন্ধু এবং ছাত্রদলের অন্যান্য নেতাকর্মী ও তাঁদের অনুসারীদের সঙ্গে চলাফেরা করে। আমি তাকে চিনিও না। এখানে আমি ইন্ধনদাতা কীভাবে হলাম? এ মিথ্যা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত।”

পাল্টা অভিযোগ করে মিজু আরও বলেন, “৪ নভেম্বর আমরা করিম ভবনে এক জুনিয়রকে সাহায্য করতে গিয়েছিলাম। ফেরার পথে আমাদের সঙ্গে থাকা সোহরাওয়ার্দী হলের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ইয়ামিন পাশের খাবারের দোকানে গেলে তাঁর ওপর অতর্কিত হামলা করা হয়। এ ঘটনায় আমরাও লিখিত অভিযোগ জমা দেব।”

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. আবদুল আলীম বলেন, “সিয়ামের অভিযোগপত্র আমরা পেয়েছি। ভিডিও ফুটেজসহ বিভিন্ন প্রমাণ যাচাই করে দেখা হচ্ছে। ঈশা খাঁ হলের জুনিয়র শিক্ষার্থীরা সোহরাওয়ার্দী হলের একজন সিনিয়র শিক্ষার্থীকে মারধর করেছে, এমন অভিযোগও আমরা পেয়েছি। সব বিষয়েই প্রক্টরিয়াল বডি তৎপর রয়েছে। হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।”

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *