আইএমএফের শর্তের বেড়াজালে নতুন বেতন কাঠামো।

মো: আকতার হোসাইন // ব্যাংকার ও কলামিস্ট:

দেশে দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতি নাগালের বাইরে। যেখানে সরকারি কর্মচারীদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ৫ শতাংশ; ঠিক তার বিপরীতে মূল্যস্ফীতি দ্বিগুণ বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারও বেশি। সুতরাং সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি অত্যন্ত যৌক্তিক একটি বিষয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৫ সালে অষ্টম বেতন কাঠামো নির্ধারণ করলেও দীর্ঘদিন যাবৎ তা ঝুলে রয়েছে। তাই মানুষের দীর্ঘদিনের চাওয়া হলো, তাদের বেতন কাঠামো পরিবর্তন করে সময়োপযোগী বেতন কাঠামো নির্ধারণ করবে বর্তমান সরকার। কিন্তু এমন অবস্থায় বাধাগ্রস্ত হয় আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থা আইএমএফের শর্তের বেড়াজালে। বাংলাদেশ সরকার বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করবে—বিষয়টি অনেকটা নিশ্চিত। বর্তমান বছরের জুলাই থেকেই কার্যকর হবে নতুন বেতন কাঠামো। তবুও সংশয় থাকে, আইএমএফের শর্তের ফলে কবে নাগাদ তা কার্যকর হবে।দীর্ঘদিন থেকে সরকারি কর্মকর্তাদের দাবি হলো বেতন কাঠামো বৃদ্ধি করা। কিন্তু তাদের চাওয়া-পাওয়া কখনোই দ্বিগুণ ছিল না; তারা সময়োপযোগী একটি বেতন কাঠামো চেয়েছেন। কিন্তু সেই বেতন কাঠামোয় ঘি ঢালেন বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তারা নতুন বেতন কাঠামো উপস্থাপন করে যান, যেখানে দেখা যায়, তাদের বেতন কাঠামো কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্বিগুণেরও বেশি। যা বর্তমান সরকারের জন্য এবং ভঙ্গুর এই অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং একটি বিষয়। সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো বৃদ্ধির দাবি ছিল, এটি সত্য; কিন্তু কখনোই দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাক, এমনটা কখনোই কাম্য ছিল না। কিন্তু এই দ্বিগুণ বা তারও বেশি বেতন বৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতিকে যেমন উসকে দিতে পারে, তেমনি বেসামাল অর্থনীতিকে আরও বেসামাল করে তুলতে পারে। যদিও সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ বলেছেন, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বেতন কাঠামোর তেমন একটা সম্পর্ক নেই। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বলেন, নতুন বেতন কাঠামো মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলবে। তাই তো বর্তমান সরকার নতুন বেতন কাঠামো তিন বছরে বাস্তবায়নের চিন্তা করছে। যাতে মূল্যস্ফীতি ঠিক রেখে বেতন কাঠামোকে ঢেলে সাজানো যায়। যা অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং সময়োপযোগী একটি চিন্তাভাবনা। যেখানে অর্থনীতির অন্যতম নিয়ামক মূল্যস্ফীতি ঠিক রেখে বেতন কাঠামো বৃদ্ধি করা কিছুটা হলেও সম্ভব হবে।কিন্তু বাধ সাঁধে নতুন বেতন কাঠামো তৈরিতে আইএমএফের শর্ত, ফলে একটু সংশয় তৈরি হয়। কারণ গত ৯ জুন আইএমএফকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। যেখানে ঋণের পরিমাণ হতে পারে ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি ডলার। তার পরিপ্রেক্ষিতে ‘১২ থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত আইএমএফের বাংলাদেশ মিশনের প্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল অর্থ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করে। এসব বৈঠকে সংস্থাটি পাঁচটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। সেগুলো হলো—রাজস্ব আয় বৃদ্ধি; মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ; বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা; সরকারি ব্যয় বাস্তবায়নের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং খাতের দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার’ (বাংলা ট্রিবিউন, ১৭ জুলাই ২০২৬)। সুতরাং বর্তমান সরকারের ওপর এক ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন নিয়ে। যদিও সরকার বলছে, তারা নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করবেই।আবার ‘নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ১২ জুলাই থেকে ঢাকা সফররত আইএমএফ প্রতিনিধি দল অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠকে চলমান আর্থিক সংকটের মধ্যে বড় পরিসরে বেতন বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সংস্থাটির মতে, অর্থনীতিতে অতিরিক্ত অর্থের প্রবাহ সৃষ্টি হলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাদের মতে, পর্যাপ্ত অর্থের উৎস নিশ্চিত না করে পুরো পে-স্কেল একসঙ্গে বাস্তবায়ন করলে সামষ্টিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে।’ (যুগান্তর, ১৬ জুলাই ২০২৬)আমি গত ২১ জুন ২০২৬ তারিখে আমাদের সময় পত্রিকায় ‘ঘাটতি বাজেট: সম্ভাবনা ও সংকট’ নিয়ে লিখেছিলাম। বিশাল এই ঘাটতি বাজেটের ঘাটতি পূরণের জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে ঋণ গ্রহণ করতে হবে বর্তমান সরকারকে এবং এই ঋণ গ্রহণের জন্য মানতে হবে আন্তর্জাতিক সংস্থার নানাবিধ শর্ত। যে শর্তের বেড়াজালে পড়ে বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত বাজেট পূর্ণাঙ্গ রূপে বাস্তবায়ন করা অসম্ভব হবে বলে জোর দিয়েছিলাম এবং জোর দিয়েছিলাম বাংলাদেশের বাজেট প্রণয়নে ঘাটতিনির্ভরশীলতা কমিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার উপায় নিয়ে। সুতরাং বাজেট বাস্তবায়নের এক মাস না যেতেই গ্রহণ করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থা আইএমএফের কাছ থেকে বিশাল অঙ্কের ঋণ। যে ঋণের শর্ত মেটাতে গিয়ে চাপে পড়েছে বর্তমান সরকার, সংশয় তৈরি হয়েছে বহুল আকাঙ্ক্ষিত সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন নিয়ে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে যতদিন না স্বাবলম্বী হতে পারবে, ততদিন এ ধরনের শর্তের বেড়াজালে পড়তেই হবে। যদিও আইএমএফের শর্তের কারণে বর্তমান সরকার রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করতে বাধ্য হচ্ছে। কর-জিডিপির হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি যে শুধু বর্তমান সরকারের ওপরই চাপ প্রয়োগ করেছে, বিষয়টি এমন নয়। বিগত সকল সরকারের সময়ও এমনটি হয়েছে এবং আইএমএফ থেকে যারা ঋণ গ্রহণ করে, তাদেরকে মানতে হয় আইএমএফের শর্ত। যে শর্তগুলো দেশের সরকারের জন্য অনেক সময় সুফল বয়ে আনতে নাও পারে। তবে বর্তমান সরকার নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন নিয়ে দৃঢ় সংকল্পে অনড় রয়েছে। বাস্তবায়নে সময়ক্ষেপণ হলেও বাস্তবায়িত হবে বর্তমান বেতন কাঠামো। প্রয়োজনে এরিয়ারসহ দেওয়া হবে সরকারি চাকরিজীবীদের—এমন আভাসই পাওয়া যায় সরকারি দপ্তর থেকে।কারণ বর্তমান সরকার নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য ইতিমধ্যেই জাতীয় বাজেটে নির্দিষ্ট পরিমাণ বরাদ্দ রেখেছে। যেমন, ‘সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে নবম পে-স্কেলের জন্য অতিরিক্ত ৪৪ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রয়োজন হবে। এই অর্থ বাজেটের অপ্রত্যাশিত ব্যয় খাতে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তবে জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে বছরে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে। সরকার আগামী অর্থবছরের মধ্যে ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ পে-স্কেল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে।’ (যুগান্তর, ১০ জুলাই ২০২৬)নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীরা যতটা না উদ্বিগ্ন, তার চেয়ে বেশি চিন্তিত এবং উদ্বিগ্ন রয়েছে বর্তমান সরকার। কারণ একদিকে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বড়ই নড়বড়ে, অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনীতি যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিস্থিতির কারণে চরম চাপে এবং আন্তর্জাতিক শর্তের বেড়াজালে পড়ে বর্তমান সরকারও চাপে রয়েছে, এটি বলাই যায়। সুতরাং সরকারি চাকরিজীবীদের ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা ছাড়া এই মুহূর্তে আর তেমন কিছু নেই বলেই মনে হয়। প্রত্যেকের উচিত দেশকে ভালোবেসে দেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা। যে যেখানে, যে অবস্থায় কর্মরত থাকুক না কেন, প্রত্যেকের দেশপ্রেমকে শতভাগ জাগ্রত করতে হবে। সকল প্রকার দুর্নীতি ও অন্যায়কে রুখে দিতে হবে। তবেই হয়তো নতুন বেতন কাঠামোর অপেক্ষায় থাকতে হবে না দীর্ঘদিন। বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হোক—এমন প্রত্যাশা সকলেরই।


aktarrofikul@gmail.com
01723-576597

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *