ডা. ফাহমিদা সুলতানা জোনাকী:
উত্তরের জনপদ শুধু মানচিত্রের একটি প্রান্ত নয়। এই জনপদ হলো সবুজ ধানক্ষেতের বিস্তীর্ণ প্রান্তর, নদী-খালের কলতান, মাটির ঘ্রাণ, কৃষকের ঘাম, প্রাণ-প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য আর সীমান্তঘেঁষা মানুষের নিরন্তর সংগ্রাম। এই জনপদের রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অপার সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল প্রতীক হলো ঠাকুরগাঁও।
শীতের আগমনে কোনো এক নির্মল সকালে উত্তরের আকাশ যখন স্বচ্ছ নীল হয়ে ওঠে, দূর দিগন্তে কাঞ্চনজঙ্ঘার শুভ্র চূড়া যখন দৃশ্যমান হয়, তখন প্রকৃতির সৌন্দর্যের সঙ্গে মানুষের স্বপ্নও যেন একাকার হয়ে যায়। মনে হয়—এই জনপদের অপরূপ প্রাণ-প্রকৃতির সঙ্গে যদি জ্ঞান, গবেষণা, প্রযুক্তি ও উন্নয়নের শক্তি যুক্ত করা যায়, তবে দেশের সর্বউত্তরের এই প্রান্তর শুধু মানচিত্রের একটি জনপদ হয়ে থাকবে না; বরং হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের নতুন সম্ভাবনার প্রতীক।
সেই সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনের পথে ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক—যার আলোয় উত্তরাঞ্চলের মাটি, মানুষ, প্রকৃতি ও অর্থনীতি পেতে পারে নতুন গতি, আর নতুন প্রজন্ম পেতে পারে নিজের মাটিতে দাঁড়িয়ে বিশ্বকে জয় করার স্বপ্ন।
অপার সম্ভাবনাময় এই জনপদের দীর্ঘদিন ধরেই একটি আক্ষেপ ছিল উচ্চশিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগের অভাব। উত্তরের মেধাবী তরুণদের অনেককেই উচ্চশিক্ষার জন্য ছুটতে হয়েছে দূর-দূরান্তের শহরে। কারও কাছে এই যাত্রা ছিল স্বপ্নপূরণের, আবার কারও কাছে অর্থনৈতিক সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতায় তা হয়ে উঠেছে অসম্ভব এক পথ। ফলে এই অঞ্চলের অসংখ্য মেধা ও সম্ভাবনা যথাযথ বিকাশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় সেই দীর্ঘ আক্ষেপের অবসানের একটি নতুন প্রত্যাশা। এটি শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নয়; এটি উত্তরের মানুষের বহুদিনের উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষা, তরুণদের স্বপ্ন এবং একটি জনপদের এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ের প্রতিফলন। একটি বিশ্ববিদ্যালয় যখন কোনো অঞ্চলের মাটিতে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তার সঙ্গে শুধু ভবন নির্মিত হয় না—নির্মিত হয় নতুন স্বপ্ন, নতুন চিন্তার পরিসর এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাবনার ভিত্তি।
বিশ্ববিদ্যালয়টি যদি অপার সম্ভাবনাকে ধারণ করতে পারে, তবে বৃহত্তর উত্তরের জনপদের মাটি ও মানুষের সঙ্গে জ্ঞান ও গবেষণার একটি গভীর সংযোগ তৈরি হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে উৎপন্ন জ্ঞান পৌঁছাবে কৃষকের মাঠে, স্থানীয় উদ্যোক্তার কর্মক্ষেত্রে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে।
মহামান্য রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মুহূর্ত তাই উত্তরের মানুষের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এটি যেন দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর একটি স্বপ্নের দৃশ্যমান রূপ। তবে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনই শেষ নয়; বরং এখান থেকেই শুরু হবে স্বপ্ন বাস্তবায়নের কঠিন পথ।
ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে আজ যে স্বপ্ন, সেটি কেবল ঠাকুরগাঁওয়ের নয়। পঞ্চগড়, দিনাজপুর, নীলফামারী, রংপুরসহ বৃহত্তর উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষের স্বপ্নের সঙ্গে এটি যুক্ত। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আলো যদি একটি অঞ্চলের অন্ধকার দূর করতে পারে, তবে তার প্রভাব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পরে।
সকলের প্রত্যাশা, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে উত্তরাঞ্চলের প্রকৃতির প্রতিফলন থাকুক, গবেষণায় থাকুক উত্তরের মানুষের জীবন ও জীবিকার কথা, আর শিক্ষায় থাকুক বিশ্বমানের জ্ঞানের সঙ্গে স্থানীয় বাস্তবতার মেলবন্ধন। এখান থেকে বেরিয়ে আসা শিক্ষার্থীরা যেন শুধু চাকরির বাজারে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত না করে; বরং তারা যেন নিজেদের অঞ্চলের সমস্যা বুঝতে পারে, সমাধানের পথ খুঁজতে পারে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে।