‎শিক্ষার্থীর অর্জন, শিক্ষকের প্রেরণা: প্রফেসর ড. বাহানুর স্যারের অনন্য উদ্যোগ


ডাঃ ফাহমিদা সুলতানা জোনাকী

একজন শিক্ষকের প্রকৃত সাফল্য কেবল শ্রেণিকক্ষে পাঠদান কিংবা পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। শিক্ষার্থীর মেধা, পরিশ্রম ও সাফল্যকে স্বীকৃতি দিয়ে তাকে ভবিষ্যতের পথে আরও এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দেওয়াও একজন শিক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কেননা একটি ছোট্ট স্বীকৃতি অনেক সময় একজন শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাসকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে, তৈরি করতে পারে আরও বড় স্বপ্ন দেখার সাহস।

‎বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ভেটেরিনারি ফ্যাকাল্টিতে এমনই একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগের সূচনা হয়েছে।ভেটেরিনারি ফ্যাকাল্টির ডিন প্রফেসর ড. বাহানুর রহমান স্যারের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো ‘একাডেমিক অ্যাওয়ার্ড–২০২৬’ প্রদান করা হয়।প্রথমবারের এই আয়োজনে বাকৃবির ভেটেরিনারি ফ্যাকাল্টির ২০১৯–২০ শিক্ষাবর্ষের ৮ জন কৃতী শিক্ষার্থীকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় সম্মাননা ক্রেস্ট ও সার্টিফিকেট। দীর্ঘ একাডেমিক পথচলায় তাদের অর্জন ও কৃতিত্বকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার এই মুহূর্ত নিঃসন্দেহে শিক্ষার্থীদের জন্য আনন্দ ও গর্বের। নিজের শিক্ষাজীবনের এমন একটি স্বীকৃতির কথা স্মরণ করতে গিয়ে অনুভূতিটা নিছক একটি পুরস্কার পাওয়ার আনন্দে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, পরীক্ষার প্রস্তুতি, ব্যর্থতা পেরিয়ে এগিয়ে চলা এবং নিজের স্বপ্নকে ধরে রাখার গল্প। একটি ক্রেস্ট ও সার্টিফিকেট তাই হয়ে ওঠে সেই দীর্ঘ পথচলার একটি দৃশ্যমান স্বীকৃতি।

‎ভেটেরিনারি শিক্ষার মত একটি বিশেষায়িত ও দায়িত্বপূর্ণ শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জনের মাঝে সীমাবদ্ধ রাখলে চলে না; প্রাণীর স্বাস্থ্য, রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা, জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা এবং প্রাণিসম্পদ উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও দক্ষতা অর্জন করতে হয়। ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের  জ্ঞান ও দক্ষতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কৃষক, খামারি, প্রাণীসম্পদ এবং বৃহত্তর জনস্বাস্থ্যের স্বার্থ। তাই  শিক্ষার্থীদের একাডেমিক উৎকর্ষকে স্বীকৃতি দেওয়া নিঃসন্দেহে ভেটেরিনারি শিক্ষার মানোন্নয়নের বৃহত্তর লক্ষ্যকেও উৎসাহিত করে।

‎প্রফেসর ড. বাহানুর রহমান স্যারের এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো–এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুস্থ একাডেমিক প্রতিযোগিতা ও উৎকর্ষের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখতে পারে। একজন শিক্ষার্থী যখন দেখবে তার সহপাঠী বা বড়রা পরিশ্রম ও মেধার স্বীকৃতি পেয়েছে, তখন তার মধ্যেও ভালো করার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। এভাবেই একটি পুরস্কার ব্যক্তিগত অর্জনের সীমানা ছাড়িয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রেরণায় রূপ নিয়ে থাকে।

‎একজন শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু শিক্ষা,গবেষণা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও মানসিক বিকাশে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করাও নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই বিবেচনায় ভেটেরিনারি ফ্যাকাল্টিতে প্রথমবারের মতো একাডেমিক অ্যাওয়ার্ড চালুর উদ্যোগটি শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক একাডেমিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

‎আজ যারা এই সম্মাননা পেল, তারা হয়তো আগামী দিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভেটেরিনারি চিকিৎসক, গবেষক, শিক্ষক, উদ্যোক্তা কিংবা প্রাণিসম্পদ খাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে কাজ করবে। তাদের হাতে তুলে দেওয়া এই সম্মাননা তখন হয়তো কেবল একটি পুরস্কার হিসেবে স্মৃতিতে থাকবে না; বরং শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে ফিরে আসবে। তারা মনে রাখবে–তাদের মেধা ও পরিশ্রমকে কোনো এক সময়ে তাদের প্রিয় শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান স্বীকৃতি দিয়েছিল।

‎প্রথমবারের আয়োজন হিসেবে একাডেমিক অ্যাওয়ার্ড–২০২৬ হয়তো একটি ছোট্ট সূচনা। কিন্তু শিক্ষার্থীদের জন্য এর প্রতীকী গুরুত্ব অনেক বড়। আজকের এই উদ্যোগ যদি ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যায়, প্রতিবছর যোগ্য শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সাফল্য স্বীকৃতি পায় এবং পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে–তাহলে একসময় এটি বাকৃবির ভেটেরিনারি ফ্যাকাল্টির একটি সুন্দর একাডেমিক ঐতিহ্যে পরিণত হতে পারে।কারণ সম্মাননা শুধু বলে না–‘তুমি ভালো করেছ’; এটি একই সঙ্গে বলে–‘তুমি আরও ভালো করতে পারবে।’

‎এই আটজন সম্মাননাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীর একজন হওয়ার সৌভাগ্য আমারও হয়েছে। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে নিজের একাডেমিক পরিশ্রম ও অর্জনের স্বীকৃতি পাওয়া নিঃসন্দেহে আনন্দের এবং গর্বের। তবে আমার কাছে এই সম্মাননা শুধু একটি ক্রেস্ট কিংবা সার্টিফিকেট পাওয়ার ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘ শিক্ষাজীবনের পরিশ্রম, স্বপ্ন, প্রত্যাশা এবং শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা ও সাহস।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *