
মো: আকতার হোসাইন // ব্যাংকার ও কলামিস্ট:
কবি সুফিয়া কামাল-এর বিখ্যাত কবিতা ‘আজিকার শিশু’-এর দুটি লাইন ছিল— “আমাদের যুগে আমরা যখন খেলেছি পুতুল খেলা, তোমরা এ যুগে সেই বয়সেই লেখাপড়া কর মেলা।” অর্থাৎ তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, বর্তমান পৃথিবী ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবে। কিন্তু আমরা পড়ে আছি ১৯৭১ এবং ২০২৪ নিয়ে। যদিও নানা বৈষম্যের কারণে বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, তবুও আজও কি আমরা প্রকৃত অর্থে স্বাধীন হতে পেরেছি? নানা বৈষম্যের বেড়াজালে আজও বাংলাদেশ আবদ্ধ। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জেলা-কেন্দ্রিক উন্নয়ন হতো। বর্তমান সরকার সেই বৈষম্য করবে না, এমনটাই সবার প্রত্যাশা। স্বাধীনতা অর্জন করা বাংলাদেশের জন্য ছিল অবশ্যম্ভাবী। কারণ তখন বাঙালির অস্তিত্বই ছিল সংকটাপন্ন; তাই স্বাধীন হওয়া ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প ছিল না। কিন্তু ২০২৪ সাল ছিল একটি বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশের লক্ষ্যে দুর্বার আন্দোলনের বছর। সেই আন্দোলনে বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনে বাধ্য হয় ছাত্র-জনতার কাছে। অনেকে একে অভ্যুত্থান বলে অভিহিত করেন। যেখানে হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এই নতুন বাংলাদেশ।
এখন প্রশ্ন হলো, বর্তমান সময়ে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা এবং ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানকে বাঙালির হৃদয়ে ধারণ করা কতটা যৌক্তিক? কারণ স্বাধীনতার ৫৫ বছর অতিক্রম হলেও, কিংবা ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের পরও, বাঙালি যে স্বপ্ন দেখেছিল তা কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? বাংলাদেশ এখনও অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিষয়ে এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এর পেছনে রয়েছে বিভিন্ন প্রভাব ও সীমাবদ্ধতা। বাংলাদেশ কী মন্তব্য করবে, চিঠির ভাষা কী হবে, তা অনেকাংশে নির্ধারণ করে দেয় বর্তমান বিশ্বের প্রভাবশালী শক্তিগুলো। তাই প্রশ্ন থেকেই যায়—বাংলাদেশ আজও কতটুকু স্বাধীন হলো?
এ বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হলো জাতীয় সংসদ নির্বাচন, যেখানে সাধারণ ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে বর্তমান সরকারকে নির্বাচিত করেছেন। যথারীতি বর্তমান সরকার জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন সম্পন্ন করেছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির বন্ধুর অবস্থার প্রেক্ষাপটে প্রত্যাশিত আলোচনার বিষয় ছিল, কীভাবে দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড় করানো যায়। কিন্তু সেখানে ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, দুর্দশা ও তারল্য সংকট, পাশাপাশি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পণ্য বাণিজ্যে বাণিজ্য ঘাটতি ১৯ দশমিক ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে; এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পর্যাপ্তভাবে আলোচিত হয়নি। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে শুধুমাত্র পোশাক খাতে ১৮২টি কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে নতুন করে বেকারত্বের সংখ্যা প্রায় ৩০ লক্ষ বৃদ্ধি পায় এবং নতুন করে আরও অনেক মানুষ দারিদ্র্যে নিমজ্জিত হয়।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ৬ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এই অনুপাত কীভাবে বৃদ্ধি করা যায়, সে বিষয়ে কোনো ধরনের আলোচনা বা সমালোচনা হয়নি। একইভাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল ২২ দশমিক ৩ শতাংশ, যা বর্তমানে জিডিপির ২৩ থেকে ২৪ শতাংশের মধ্যে অবস্থান করছে, এ বিষয়েও কোনো আলোচনা হয়নি।
ইরান, ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং ভবিষ্যৎ পরিস্থিতিও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে জাতীয় সংসদে তেমন কোনো আলোচনা বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়নি। জ্বালানি সংকটের বিকল্প ব্যবস্থা নিয়েও কতটুকু আলোচনা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই। নির্বাচনের তিন দিন পূর্বে বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে চুক্তি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার করেছে, তা বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য কী প্রভাব ফেলতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তর আলোচনার সুযোগ ছিল। কিন্তু বিষয়টি নিয়েও কোনো আলোচনা হয়নি।
অথচ ১৯৭১ সালের ইতিহাস এবং ২০২৪-এর অভ্যুত্থান নিয়ে আলোচনার যেন শেষই হচ্ছে না। কোনটি বড় বা কার গুরুত্ব বেশি, কে কতটুকু সম্মান করল বা করবে, এসব নিয়ে আলোচনা বা সমালোচনা শেষই হচ্ছে না। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও ১৯৯০ বা ২০২৪ সালের প্রেক্ষাপট অনেকটা একই। মহান মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয় এবং প্রতিবেশী দেশ ভারত সে যুদ্ধে আমাদের সহযোগিতা করে। তাই তারাও সুযোগ পেলে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। আবার জামায়াতে ইসলামী মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করায় অনেকে তাদের কটাক্ষ করতেও ছাড়ে না। অন্যদিকে, ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার যে অভ্যুত্থান হয়, সেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকার মধ্যে জামায়াতে ইসলামী এগিয়ে থাকায় তারা এ বিষয়টি বারবার সামনে নিয়ে আসে। এখন বিষয় হলো, দুটি ঘটনাই হৃদয়ে ধারণ করার মতো। এই দুই বিষয় আমাদের অন্তরে ধারণ করেই সামনে এগিয়ে যেতে হবে। কখনোই এগুলো ভুলে গেলে চলবে না। তবে এসব বিষয়ের দ্রুত সমাধান করে দেশের নানা সংকট নিয়ে আলোচনা করা এবং দেশকে আরও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করার দিকেও মনোযোগ দেওয়া জরুরি।
অতীতের সকল ঘটনা আমাদের অস্তিত্ব এবং মন-মগজে ধারণ করতে হবে। কিন্তু তা ধারণ করতে গিয়ে দেশকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হবে, বিষয়টা এমনটা নয়। এখন সময় দেশকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধিশালী করার। কারণ দিনশেষে অর্থনৈতিক মুক্তিই প্রকৃত মুক্তি বা স্বাধীনতা, যেখানে দেশকে কারও চোখ রাঙানি বা শর্তের বেড়াজালে পড়তে হবে না। সমগ্র বিশ্ব, বিশেষ করে উন্নত দেশগুলো, ১০০ বছর সামনে চিন্তা করে। ঠিক সেই সময় আমরা এখনও ৭১ এবং ২৪ নিয়ে ভাবি। অর্থাৎ সমগ্র বিশ্বই তাদের দেশকে আগামী ২১০০ সালে বা অন্তত ৫০ বছর পরে কীভাবে দেখতে চায়, সেই পরিকল্পনা করে এবং সে অনুযায়ী কর্মপরিকল্পনা সাজিয়ে ফেলে। আর আমরা এখনও ১৯৭১ বা ২০২৪ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণে ব্যস্ত, যেন এগুলো না হলে দেশ দুবেলা দুমুঠো খাবারও পাবে না। বিপরীতে আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তি যেন ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়।
সুতরাং এখনই ভাববার সময়, আমরা আর কতকাল অর্থনৈতিকভাবে পরাধীন থাকব। যে দেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যা ৬৫ শতাংশের উপরে, সেই দেশ কীভাবে দারিদ্র্যের চরম অভিশাপে অভিশপ্ত হয়, এটি অনেকের কাছেই হয়তো বোধগম্য নয়। আমাদের দেশে রাষ্ট্রনায়ক আসে এবং চলে যায়, কিন্তু কেউই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে অর্থাৎ দেশকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধিশালী করতে সফল হতে পারেন নাই। এর অন্যতম মূল কারণ অতীত ইতিহাস নিয়ে অপচর্চা। নাম পরিবর্তনের খেলায় রাষ্ট্র অজস্র অর্থ ও সময় ব্যয় করা। ফলে, অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধিশালী হওয়ার যে সামান্য সুযোগ থাকে, সেখান থেকেও দেশ যোজন যোজন পিছিয়ে যায়। তাই প্রশ্ন থেকেই যায়, বর্তমান সময়ে ৭১ এবং ২৪ বাঙালির হৃদয়ে ধারণ কতটা যুক্তি? বিষয়টি অবশ্যই যুক্তিক। কিন্তু দেশ আজও অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন নয়। কারণ অর্থনৈতিক মুক্তি হলো আসল স্বাধীনতা। তাই জাতীয় স্বার্থে দেশকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে এখনই সময়। সকল ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে একটি সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও সমৃদ্ধিশালী দেশ গঠনের মাধ্যমে শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। আর সেই লক্ষ্যেই সকলে একত্রে কাজ করাই হবে মূল উদ্দেশ্য।