পীরগাছায় সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিককে মারধর, অভিযুক্ত শিক্ষকরা

পীরগাছা (রংপুর) প্রতিনিধি:
রংপুরের পীরগাছায় শিক্ষকতার আড়ালে দালালির অভিযোগ উঠেছে সাংবাদিককে মারধরের ঘটনায় অভিযুক্ত তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে| স্থানীয়দের অভিযোগ, তারা নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত থেকে উপজেলা সদরে অবস্থান করেন এবং বিভিন্ন দালালি কার্যক্রমে জড়িত থাকেন| সম্প্রতি দাখিল পরীক্ষায় ভুয়া পরীক্ষার্থী, নকল বাণিজ্য ও বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশের পর তাদের সার্থে আঘাত লাগে| এর জেরেই সাংবাদিক আব্দুল কুদ্দুছ সরকারের ওপর সংঘবদ্ধ হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে|
বুধবার (২০ মে) রাত পৌণে ৮টার দিকে উপজেলার সোনালী ব্যাংক সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে| আহত আব্দুল কুদ্দুছ সরকার ˆদনিক সংবাদের পীরগাছা প্রতিনিধি ও পীরগাছা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক|
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ¯^চাষ তালতলা দাখিল মাদরাসার সুপার লুৎফর রহমান নিয়মিত সোনালী ব্যাংকে অবস্থান করে দালালিতে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে| স্থানীয়দের ভাষ্য, ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজসে শিক্ষক ও ঋণগ্রহীতাদের সহযোগিতার নামে অর্থ হাতিয়ে নেন তিনি|
অন্যদিকে, দক্ষিণ ছাওলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাময়িক বরখাস্তকৃত সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলাম দুলাল ও রামচন্দ্র মৌজা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমানের বিরুদ্ধে উপজেলা শিক্ষা অফিসকেন্দ্রিক দালালির অভিযোগ রয়েছে| তারা শিক্ষকদের বিভিন্ন প্রশাসনিক সমস্যা সমাধানের নামে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে অর্থ আদায় করেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে|
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস ছালাম বলেন, ‘স্কুলে তাদের যতটা দেখা যায়, তার চেয়ে বেশি দেখা যায় উপজেলা অফিস আর ব্যাংকে| শিক্ষকতার চেয়ে দালালিতেই তারা বেশি ব্যস্ত|’
হাবিবুর রহমান বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষকদের এক ধরনের জিম্মি করে ফেলা হয়েছে| বদলি, বেতন, তদন্ত, কাগজপত্র, সবকিছুতেই দালাল চক্র সক্রিয়|’
হারুন অর রশিদ বলেন, ‘শিক্ষকতা এখন আড়াল মাত্র| দিনের বেশির ভাগ সময় তারা উপজেলা সদরে কাটান|’
ভুক্তভোগী সাংবাদিক আব্দুল কুদ্দুছ সরকার বলেন, গত ১৪ মে ˆদনিক সংবাদসহ একাধিক পত্রিকায় ‘লাখো টাকার চুক্তিতে চলছে দাখিল পরীক্ষায় অনিয়ম’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়| প্রতিবেদনে দাখিল পরীক্ষায় ভুয়া পরীক্ষার্থী, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, নকল বাণিজ্য ও অনিয়মের বিভিন্ন তথ্য উঠে আসে| সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই অভিযুক্তরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন|
তিনি বলেন, বুধবার রাতে সোনালী ব্যাংকের নিচে মুহিব কম্পিউটারে বসে সংবাদ লেখার কাজ করছিলেন তিনি| এ সময় ¯^চাষ তালতলা দাখিল মাদরাসার সুপার লুৎফর রহমান তাকে বাইরে ডাকেন| দোকানের বাইরে গেলে পূর্বপরিকল্পিতভাবে তার ওপর হামলা চালানো হয়|
কুদ্দুছ সরকার অভিযোগ করেন, হামলায় নেতৃত্ব দেন মাদরাসা সুপার লুৎফর রহমান| এ সময় রফিকুল ইসলাম দুলাল ও প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমানও অংশ নেন| হামলার আগে মোবাইল ফোনে কল করে তার অবস্থান নিশ্চিত করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি|
তিনি বলেন, হামলার সময় অভিযুক্তরা বিভিন্ন হুমকি দেন| একপর্যায়ে মাদরাসা সুপার লুৎফর রহমান বলেন, ‘আমার ছেলে-মেয়েরা মাদরাসায় পড়ে| দাখিল পরীক্ষা নিয়ে নিউজ করার শখ মিটাবো|’
রফিকুল ইসলাম দুলাল বলেন, ‘দুই মাস জেল খেটেছি| তোকে খুন করে প্রয়োজনে সারাজীবন জেল খাটবো|’
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আগেও নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে|
দক্ষিণ ছাওলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাময়িক বরখাস্তকৃত সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলাম দুলালের বিরুদ্ধে এইচএসসি ও ডিগ্রির জাল সনদে চাকরি করার অভিযোগ ওঠে| এ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন অনুসন্ধান করে অভিযোগের সত্যতা পায়| পরে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়| ওই মামলায় তিনি দুই মাস কারাভোগও করেন|
অন্যদিকে, রামচন্দ্র মৌজা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমানের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের বার্ষিক পরীক্ষায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ ওঠে| সেদিন সকালের পরীক্ষা শেষে বিদ্যালয় বন্ধ করে শিক্ষকরা চলে যাওয়ায় বিকেলের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি| পরীক্ষা দিতে এসে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে তালা ঝুলতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে| পরে এ ঘটনায় তাকে শোকজ করা হয়|
অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমান বলেন, ‘আমি ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলাম| সাংবাদিকের গায়ে হাত দেয়া হয়েছে| এটা ঠিক হয়নি|’
তবে মূল অভিযুক্ত ¯^চাষ তালতলা দাখিল মাদরাসার সুপার লুৎফর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি|
পীরগাছা প্রেস ক্লাবের সিনিয়র সহ-সভাপতি ফজলুর রহমান বলেন, ‘অনিয়ম ও দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশের জেরে সংঘবদ্ধভাবে এ হামলা চালানো হয়েছে| সাংবাদিকদের ভয় দেখিয়ে সত্য প্রকাশ বন্ধ করা যাবে না| আমরা দ্রুত হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করছি|’
পীরগাছা থানার ওসি একেএম খন্দকার মহিব্বুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ পেয়েছি| তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে|

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *