হাওরে আগাম বন্যা মোকাবেলায় স্বল্পমেয়াদি বোরো ধান চাষে বাকৃবি গবেষকদের সাফল্য

বাকৃবি সংবাদদাতা:

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অঞ্চল প্রতিবছরই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানা ঝুঁকির মুখে পড়ে। ভৌগোলিকভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় নিচু হওয়ায় আকস্মিক বন্যায় দ্রুত পানিতে প্লাবিত হয়ে বিশাল জলাভূমিতে রূপ নেয় পুরো এলাকা। ফলে এ অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা স্বভাবতই অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

হাওরাঞ্চলের প্রধান ফসল বোরো ধান হলেও আগাম বন্যা, শিলাবৃষ্টি, খরা এবং শীতজনিত চাপ উৎপাদনে বড় বাধা সৃষ্টি করে। বিশেষ করে আগাম বন্যার কারণে ফসল ঘরে তোলার আগেই ক্ষতির মুখে পড়েন কৃষকেরা, যার প্রভাব পড়ে দেশের সামগ্রিক ধান উৎপাদনেও।

এই প্রেক্ষাপটে হাওরাঞ্চলের কৃষি ঝুঁকি কমাতে স্বল্পমেয়াদি বোরো ধান চাষ ও বন্যার আগেই ফসল সংগ্রহের উপযোগী কৌশল উদ্ভাবনে সফলতা পেয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক।

আজ মঙ্গলবার ( ৪ মে) বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সম্মেলন কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মো হাবিবুর রহমান প্রামানিক। এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন গবেষণার সহযোগী গবেষক অধ্যাপক ড. ইসরাত জাহান শেলী। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন গবেষণার সাথে সংশ্লিষ্ট স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীরা।

গবেষক অধ্যাপক ড. মো হাবিবুর রহমান প্রামানিক বলেন,, ‘দেশের মোট ধান উৎপাদনের ৬০ শতাংশ উৎপন্ন হয় বোরো মৌসুমে। আর মোট বোরোধানের উৎপাদনের ১৮ শতাংশ হাওরাঞ্চলে উৎপন্ন হয়। তবে প্রায় প্রতিবছর আগাম বন্যায় ধানের ১০ থেকে প্রায় ১০০ শতাংশই ক্ষতির মুখে পরে। কৃষকেরা ধান ঘরে তুলতে পারেননা। এ পরিস্থিতিতে বন্যা শুরুর আগেই যদি ধান ঘরে তুলতে পারি তাহলে বন্যা থেকে ধানের ফসল পরিত্রাণ পাবে। এক্ষেত্রে হাওরে প্রচলিত দীর্ঘমেয়াদি বোরোধানের পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি ধানের জাত চাষ করলে ১৫ থেকে ২০ দিন আগেই ফসল তোলা সম্ভব। এতে বন্যার ক্ষতি এড়ানো সম্ভব।’

তিনি জানান, ২০২০ সাল থেকে আমরা হাওরে স্বল্পমেয়াদী বোরোধান চাষের গবেষণা শুরু করি। হাওরে মূলত বোরোধানই একমাত্র ফসল হিসেবে চাষ করা হয়। অগ্রহায়ণ মাসের শুরুতে হাওরের পানি নেমে গেলে ধান লাগানোর জন্য জমি ঠিক করা হয়। ডিসেম্বরের শেষে অথবা জানুয়ারির শুরুতে ধান লাগানো হয়। প্রচলিত জাতের ধান বড় হতে এপ্রিলের শেষ বা মে মাস এসে যায়। তখনি হঠাৎ বন্যার পানি নেমে আসে। সাধারণত এপ্রিলের শেষে কিংবা মে মাসের শুরুতে হাওরে পানি ঢুকতে শুরু করে। বিশেষ করে মে মাসে বন্যার প্রকোপ বেশি। এতে পুরো মাঠের ধান পানিতে ডুবে যায়। কৃষকেরা শেষ সময়ে এসে ফসল ঘরে তুলতে পারেননা।’

আগাম বন্যার তথ্য ও বিশ্লেষণ নিয়ে প্রধান গবেষক বলেন, ‘হাওরে আগাম বন্যার গত ৩৬ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হাওরে আকস্মিক বন্যার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি মে মাসে (প্রায় ৫০ শতাংশ)। এপ্রিলের শেষার্ধে প্রায় ৪২ শতাংশ এবং মার্চের শেষভাগে ও এপ্রিলের প্রথমার্ধে তুলনামূলক কম প্রকোপ দেখা গেছে। ফলে এপ্রিলের মাঝামাঝির আগেই ধান কাটতে পারলে ক্ষতির ঝুঁকি অনেকটাই কমে।

তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু আগাম বন্যা বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য মাসে শুরু হয়। কোনোভাবে যদি এর আগেই ধানের ফসল কর্তন করা যায়,  তাহলে বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে। এই চিন্তা থেকে আমরা হাওরে স্বল্পমেয়াদি বোরোধান চাষ করছি। দেখা যায়, প্রচলিত বোরোধানের তুলনায় স্বল্পমেয়াদি জাত ১৫ থেকে ২০ দিন আগেই কর্তন সম্ভব। এতে বন্যায় সমসাময়িক থেকে কিছুটা আগেই কৃষক ফসল ঘরে তুলতে পারবে।’

হাওরে স্বল্পমেয়াদি ধানের জাত নিয়ে অধ্যাপক প্রামাণিক বলেন, ‘হাওরে বহুল চাষকৃত ধানের জাত ব্রি ধান ৯২, যার জীবনকাল ১৬০। অগ্রহায়ণের প্রথমদিকে অথবা ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে এই জাতের ধান রোপণ করা হয়। তবে ধান পেকে কর্তন করতে বৈশাখের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লেগে যায়। এই সময়ে আগাম বন্যা নেমে আসে। ফলে ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হয়ে উঠে না। এক্ষেত্রে ব্রি ধান ৯২ এর পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি জাত যেমন ব্রি ধান ৮৮, ব্রি ধান ১০১, ব্রি ধান ১১৩, ব্রি ধান ১০৫, ব্রি ধান ২৫ লাগালে বন্যার আগেই কর্তন সম্ভব। এসব জাতের জীবনকাল প্রায় ১৪৫ দিনের মতো। একই সময়ে রোপণ করে হাওরে প্রচলিত ধানের জাতের চেয়ে ১৫ দিন আগেই কর্তন করা যায়।’

হাওরে বোরোধান উৎপাদনের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘ হাওরে বোরোধান চাষে বন্যার পাশাপশি আরও সমস্যা রয়েছে। যদি থোড় আসার সময় বাতাসের তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রীর কম হয় তাহলে ধান চিটা হবে। আবার ফুল আসার সময় বাতাসের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রীর বেশি হলে চিটা হবে। আবার বৈশাখ জৈষ্ঠ্য মাসে প্রচুর বৃষ্টি শুরু হয়। শিলাবৃষ্টিতে গাছের ক্ষতি হয়। তাই এমন সময়ে ধান বপণ করতে হবে যাতে ন্যূনতম এসব ক্ষতি এড়ানো যায়। আরেকটি বড় প্রতিবন্ধকতা হলো কৃষকরা চান দীর্ঘমেয়াদী অধিক ফলন দেওয়া ধান। স্বল্পমেয়াদী ধানে উৎপাদন এক থেকে দেড় টন মতো কম হওয়ার কারণে কৃষক অনুৎসাহী হয়ে পড়েন। দীর্ঘমেয়াদী ধানে বন্যায় পড়লে ১০০ভাগ ধান ই ক্ষতির মুখে পড়বে এটি তারা বুঝতে চান না অনেকসময়।’

স্বল্পমেয়াদি ধানে চাষের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আকস্মিক বন্যা পরিহারে এপ্রিলের প্রথমার্ধে বোরোধান কর্তন করতে হলে অবশ্যই ১০ জানুয়ারির মধ্যে চারা রোপণ করতে হবে। ইতোমধ্যে ব্রি ধান ৮৮ জাত ২৬ ডিসেম্বর রোপণ করে এপ্রিলের ৮ তারিখে কর্তন করতে পেরেছি। এতে বন্যার ক্ষতি থেকে ফসল মুক্ত। এর আগে সুনামগঞ্জে বন্যা আসার আগেই ধান কেটে ফেলতে পেরে কৃষকেরা খুশি ছিল।’

বিভিন্ন জায়গায় স্বল্পমেয়াদি ধানে লাগিয়ে আগাম কর্তনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অষ্টগ্রামে ব্রি ধান ৮৮, ব্রি ধান ২৫ এর চারা ২ জানুয়ারি লাগিয়ে এপ্রিলের ১২ তারিখে কর্তন করা গেছে। এ আর ইটনাতে স্বল্পমেয়াদি জাত ব্রি ধান ১১৩ জানুয়ারির ১০ তারিখে রোপণ করে ১৭ এপ্রিলের কর্তন সম্ভব হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ব্রি ধান ৯২ এখনো কর্তন সম্ভব হয়নি।’

কৃষি যান্ত্রিকিকরণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘হাওরে যেহেতু স্বল্পসময়ে ধানের চারা রোপণ করতে হয়, আবার একই সময়ে ধান পরিপক্ক হয়, তাই বন্যার ক্ষতি এড়াতে হাওরে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের বিকল্প নেই। আগাম বন্যা যেহেতু এপ্রিলের শেষার্ধে অথবা মে মাসের শুরু হয়, তাই কৃষির উন্নত ব্যবস্থাপনার জন্য রাইচ ট্রান্সপ্লান্টার, হার্ভেস্টার, সেচ সুবিধাসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণ সহজলভ্য হবে। এতে দ্রুতই এবং একই সাথে ফসল তোলা যাবে।’

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *