দেশি আমের জন্য নতুন দুয়ার: গাবতলীতে চালু হচ্ছে আধুনিক ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বাংলাদেশের সুস্বাদু দেশি আমকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নিতে ঢাকার গাবতলীতে চালু হচ্ছে অত্যাধুনিক ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট (VHT) প্ল্যান্ট। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) প্রতিষ্ঠিত এই প্ল্যান্ট উদ্বোধনের মাধ্যমে দেশের আম রপ্তানিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, উদ্বোধনের পর গাবতলীতে অবস্থিত প্ল্যান্টটিতে প্রতিদিন প্রায় ১২ টন আম আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হবে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে রপ্তানির অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে বিবেচিত ফলের মাছি (Fruit Fly) সমস্যার কার্যকর সমাধান হবে এবং ইউরোপ, জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডসহ উচ্চমূল্যের বাজারে বাংলাদেশের আম প্রবেশের সুযোগ আরও বিস্তৃত হবে।

ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট এমন একটি প্রযুক্তি, যেখানে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার বাষ্প ব্যবহার করে আমের ভেতরে থাকা ফলের মাছির ডিম, লার্ভা ও অন্যান্য ক্ষতিকর জীবাণু ধ্বংস করা হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় না। ফলে আমের স্বাদ, গুণগত মান ও পুষ্টিগুণ অক্ষুণ্ণ থাকে।

বিএডিসির কর্মকর্তারা জানান, প্ল্যান্টটিতে একেক ব্যাচে প্রায় তিন টন আম বা অন্যান্য ফল প্রক্রিয়াজাত করা যাবে। ট্রিটমেন্ট শেষে ফলকে নির্ধারিত সময় ঠান্ডা পানিতে শীতল করা হবে। এতে ফলের সংরক্ষণক্ষমতা বাড়বে এবং দীর্ঘ সময় নিরাপদে বিদেশে পরিবহন করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ বিশ্বে অন্যতম প্রধান আম উৎপাদনকারী দেশ। প্রতিবছর দেশে প্রায় ২৫ থেকে ২৭ লাখ টন আম উৎপাদিত হয়। দেশে উৎপাদিত উল্লেখযোগ্য জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে গোপালভোগ, হিমসাগর, ল্যাংড়া, ফজলি, আম্রপালি, বারি আমসহ বিভিন্ন জনপ্রিয় জাত।

তবে বিপুল উৎপাদন সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনও সম্ভাবনার তুলনায় অনেক কম। এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ফলের মাছি নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক মানসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরীক্ষাগার সুবিধা, কোল্ড চেইন ও ট্রেসেবিলিটির সীমাবদ্ধতা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন গাবতলী ভিএইচটি প্ল্যান্ট চালুর মাধ্যমে এসব সীমাবদ্ধতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ দূর হবে এবং বাংলাদেশের আম বিশ্ববাজারে আরও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করবে।

বিশ্বের অনেক দেশ বিশেষ করে জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ফল আমদানির ক্ষেত্রে ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্টকে বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে বিবেচনা করে। এছাড়া ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ভারতও এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সফলভাবে আম রপ্তানি করছে।

রপ্তানিকারকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে শুধু আমের স্বাদই নয়, উৎপাদন পদ্ধতি, নিরাপদ কৃষিচর্চা (GAP), কীটনাশক ব্যবহারের রেকর্ড, প্যাকেজিং, ট্রেসেবিলিটি এবং কোয়ারেন্টাইন শর্ত পূরণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নতুন প্ল্যান্ট এসব মানদণ্ড পূরণে বড় সহায়ক হবে।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এই প্ল্যান্ট শুধু আম রপ্তানিই বাড়াবে না, বরং কৃষক, ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনারও সৃষ্টি করবে। আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যে দেশি আম বিক্রির সুযোগ তৈরি হলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন, উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও বাড়বে।

তারা আরও বলেন, একটি ভিএইচটি প্ল্যান্টই যথেষ্ট নয়। দেশের প্রধান আম উৎপাদনকারী অঞ্চল—রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, দিনাজপুর ও সাতক্ষীরাসহ অন্যান্য এলাকায় পর্যায়ক্রমে একই ধরনের আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, কোল্ড স্টোরেজ, উন্নত প্যাকেজিং, রেফ্রিজারেটেড পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার গড়ে তুলতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস, গাবতলীতে এই আধুনিক ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট চালুর মাধ্যমে বাংলাদেশের আম রপ্তানি নতুন গতি পাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় আমের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *