মো: আকতার হোসাইন // ব্যাংকার ও কলামিস্ট:
অতি সম্প্রতি বর্তমান সরকারপ্রধান চীন সফর করে এসেছেন। যেখানে প্রধানমন্ত্রীর সফরে সইয়ের জন্য চুক্তি, সমঝোতা স্মারকসহ ১৫টির বেশি দলিলের তালিকায় থাকলেও ১৩টি সমঝোতা স্মারক সই হয়। কিন্তু তালিকায় ছিল না তিস্তা মহাপরিকল্পনা, যা নিয়ে উত্তরবঙ্গ অনেকটাই আশাহত হয়েছে। তাহলে কি এবারও হবে না তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন?
বাংলাদেশ পূর্ব পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা লাভ করে বৈষম্য নিরসন থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে নিজেকে বৈষম্যমুক্ত করতে পারলেও নিজেই বৈষম্যের বেড়াজালে পড়ে যায়। যে বৈষম্য নিরসন করতে গিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশ আরও একটি রক্তক্ষয়ী আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে হাসিনা সরকারের পতন ঘটায়। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি আদৌ বৈষম্য দূর করতে পেরেছে? বৈষম্যের বিষয়টি সামনে আসলেই উঁকি দেয় উত্তরবঙ্গের চিত্র। উত্তরবঙ্গের রংপুর বিভাগটি আজও বৈষম্যের শিকার হয়ে আছে। তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন। যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীন আগ্রহী হলেও ভারতের বিরোধিতায় তা বারংবার দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। সময়ের প্রশ্ন হলো, তিস্তা মহাপরিকল্পনা আদৌ কি আলোর মুখ দেখবে, নাকি নতুন করে আরও একটি তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প হাতে নেওয়া হবে?
উত্তরের বৈষম্য নিয়ে একমাত্র লেখনীর মাধ্যমে প্রতিবাদী ব্যক্তি হলেন তুহিন ওয়াদুদ। যিনি গত ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ তারিখে প্রথম আলো পত্রিকায় উপসম্পাদকীয়তে লেখেন, যার শিরোনাম ছিল ‘তিস্তা নদীর সুরক্ষা: কী চাই, কেন চাই, কীভাবে চাই’। কী সুন্দর ও সাবলীলভাবে তুলে ধরেছেন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ভূমিকা, তিস্তা নদী নিয়ে ছেলে ভোলানোর গান। সত্যিই এ যেন উত্তরবঙ্গের সঙ্গে চরম এক বৈষম্য, যা ফুটে উঠেছে তিস্তা নদীর মহাপরিকল্পনা নিয়ে। অবাক হতেই হয়, এসব নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কি আদৌ কথা বলার কেউ ছিল না?
বলা হচ্ছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ভারতের অনুমতি ছাড়া করা যাবে না। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, চিকেন নেকের কাছে চীনের উপস্থিতি ভারত খুব সহজে মেনে নেবে না, তাছাড়া তিস্তার পানির জন্য ভারতের কাছেই যেতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ তাহলে কতটুকু স্বাধীন? আরও প্রশ্ন হলো, উত্তরবঙ্গ কেনই বা বরাবরের মতো উন্নয়নবঞ্চিত? বলা হয়ে থাকে, ভারতের আধিপত্যবাদ থেকে বাংলাদেশ নিজেকে আদৌ পুরোপুরি মুক্ত করতে পারেনি। আরও বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা, বিশেষ করে বিগত সরকারের সময়, ভারতীয়দের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করত। বর্তমান সময়ে যে গুঞ্জন উঠেছে, রংপুর বিভাগটি ভারতীয়রা চায়—সেটা অর্থের বিনিময়ে হোক বা হায়দ্রাবাদ, সিকিমের মতো করেই হোক। যদি তাই হয়, তাহলে যোগ-বিয়োগ মেলাতে গেলে রংপুর বিভাগ উন্নয়নবঞ্চিত হওয়ার এটা কি তাহলে একটি কারণ? নাকি অন্য কিছু? যা কিছুই হোক, আমরা আমাদের সার্বভৌমত্বকে অখণ্ড রাখব, এটাই আমাদের মূল লক্ষ্য। সেই সঙ্গে সামগ্রিকভাবে ন্যায্যতা এবং সমতার ভিত্তিতে উন্নয়ন সম্প্রসারণ করব।
এবার একটু ব্যাখ্যা করা যাক—তিস্তা ব্যারেজ নাকি তিস্তা মহাপরিকল্পনা। আদৌ কোন বিষয়টি হলে দেশের জন্য সবচেয়ে বেশি মঙ্গলজনক হবে। দেশের প্রতিটি বিভাগে গ্যাস সংযোগ থাকলেও রংপুর বিভাগ তার ব্যতিক্রম। আবার রংপুর তথা পুরো উত্তরবঙ্গ কৃষির জন্য বিখ্যাত। এছাড়া গার্মেন্টসের যে সস্তা শ্রম তথা শ্রমিক, যার অধিকাংশই এই উত্তরবঙ্গকেন্দ্রিক। সুতরাং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে পুরো উত্তরবঙ্গেরই উন্নয়ন ঘটবে, সেই সঙ্গে দেশের চিত্র পাল্টে যাবে। তবুও উন্নয়নবঞ্চিত এ অঞ্চল।
বাংলাদেশে ডালিয়া ব্যারেজ নামে একটি কৃষিসেচ প্রকল্প তিস্তা নদীতে বিদ্যমান রয়েছে। যা অতি খরার মৌসুমে সেচ প্রকল্প পরিচালনায় ব্যাহত হয়। অর্থাৎ কাঙ্ক্ষিত সময়ে পানি মেলে না। সেখানে নতুন করে দ্বিতীয় তিস্তা ব্যারেজ কতটুকু ফলপ্রসূ হবে? কিন্তু মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে পুরো উত্তরবঙ্গ তথা পাঁচটি জেলার উন্নয়ন প্রসার ঘটবে এবং তিস্তা নদীভাঙন প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
কারণ, ওয়াশিংটনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ফুড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (আইএফআরআই) তথ্য মতে, ‘তিস্তা নদীর অববাহিকা অঞ্চলগুলোতে সেচ প্রকল্প বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার ফলে বার্ষিক প্রায় দেড় মিলিয়ন টন বোরো ধান উৎপাদন কম হয়, যা জাতীয় উৎপাদনের প্রায় নয় শতাংশ কম। অথচ তিস্তা নদী অববাহিকায় সেচ প্রকল্প বাধাগ্রস্ত না হলে জাতীয় উৎপাদন প্রায় ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেত’। বর্ষায় তিস্তা নদীর উজানে ভারত বাঁধগুলো খুলে দিলে আকস্মিক বন্যায় তিস্তা অঞ্চল অববাহিকায় ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়, ক্ষয়ক্ষতি হয় গবাদিপশুর, রাস্তাঘাট ভেঙে যায়, ঘরবাড়ি ভেসে যায়, দুই পাড়ে নদীভাঙনসহ প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। যা এই তিস্তা নদীকে চীনের হোয়াংহো নদীর মতোই উত্তরবঙ্গের দুঃখ বলা যেতে পারে। এসব হতে রক্ষার জন্য বাংলাদেশ সরকার তিস্তা রিভার কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন প্রজেক্ট (টিআরসিএমআরপি), যা তিস্তা মহাপরিকল্পনা নামে কর্মসূচি হাতে নেয়। যা আজ অবধি আলোর মুখ দেখতে পায়নি।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে খরচ হবে প্রায় এক বিলিয়ন টাকা, কিন্তু এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফলে এতে প্রায় প্রতিবছর তিন বিলিয়ন টাকা লাভ হবে বলে ধারণা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য চীন মুখিয়ে থাকলেও বিগত আওয়ামী সরকার ভারতপ্রীতির কারণে বা উত্তরবঙ্গের মানুষের প্রতি উদাসীনতার কারণে, অথবা ভারতের অর্থায়নের প্রতিশ্রুতির কারণে ও নানা ছলাকলায় প্রকল্পটি অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয় এবং উত্তরবঙ্গের মানুষের স্বপ্নভঙ্গ হয়। কারণ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মঙ্গাপীড়িত এই উত্তরবঙ্গে মঙ্গা নিরসনে অগ্রণী ভূমিকা রাখত। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে যেসব বিষয় কাজ করা হতো তার মধ্যে অন্যতম হলো, তিস্তা নদীর প্রশস্ততা কোথাও কোথাও ৫ কিলোমিটার থেকে ৩ কিলোমিটার, তা কমিয়ে করা হবে ০.৮১৬ কিলোমিটার। নদীটির গড় গভীরতা ৫ মিটার, যা ১০ মিটারে উন্নীত করা হতো। প্রকল্পটি ঘিরে বেশ কয়েকটি জেটি বন্দর তৈরি করা হতো, নদীটির দুই পাশে চার লেনের রাস্তার কাজ করা হতো। নদীটি খনন করা হতো দীর্ঘ ১০৮ কিলোমিটার, চর রক্ষা করা হতো প্রায় ১৭৩ বর্গকিলোমিটার, বালু সরিয়ে উদ্ধার করা হতো কৃষিজমি।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে চীনা অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ২০১৬ সালে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হলেও নানা জটিলতায় সেটি থমকে যায়। পুনরায় ২০২৪ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফর করে ব্যর্থ হন এবং ওই বছর ২১ ও ২২ জুন ভারত সফর করলে; ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো বলছিল, দিল্লি কূটকৌশলে চীনকে সরে দিয়েছে। বর্তমানে চীন যথেষ্ট আগ্রহ দেখালেও তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশ নিজেই উদাসীন।
তিস্তাকে ঘিরে মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে পূর্ব চীনের জিয়াংসু প্রদেশের সুকিয়ান সিটির আদলে তিস্তার দুই পাড়ে পরিকল্পিত স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলার কথা ভাবা হচ্ছে, মাছ চাষ, আধুনিক কৃষিসেচ ব্যবস্থা, নদীভাঙন রোধ ও নদী খনন করা হবে। যা থেকে বছরে প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা সম্পদ রক্ষা পাবে এবং প্রতিবছর প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হবে। দুই পাড়ে তৈরি হবে স্যাটেলাইট শহর। তৈরি করা হবে অর্থনৈতিক অঞ্চল, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষার জন্য তৈরি করা হবে নদীবন্দর, নৌথানা, কোস্টগার্ড ও সেনা ক্যাম্প।
অথচ ১৭ এবং ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫—দুই দিনব্যাপী ৪৮ ঘণ্টার বৃহৎ কর্মসূচি দিয়েছিলেন বর্তমান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, ‘তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন’ ব্যানারে। ওই আন্দোলনে ছয় কিলোমিটার পদযাত্রা, হাঁটুপানিতে নেমে ভারতের পানি আগ্রাসনের প্রতিবাদে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন এবং সন্ধ্যা সাতটায় নদীতে নেমে মশাল প্রজ্বালন করেছিলেন হাজারো মানুষ। তিস্তা নদী বাঁচাতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সব বিকল্পকে কাজে লাগানোর তাগিদ দিয়ে পাঁচ জেলার ১১টি স্থানে জনসভায় ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন, ‘আমরা মনে করি, পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে জাতিসংঘসহ সংশ্লিষ্ট সব আন্তর্জাতিক ফোরামে জোরালোভাবে বাংলাদেশের দাবি তুলে ধরতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আমাদের কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করতে হবে।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘প্রতিবেশী দেশ ভারত যদি পানির ন্যায্য হিস্যা না দেয় বা দিতে যদি দেরি করে, তিস্তা চুক্তি করতে অনীহা প্রকাশ করে, তাহলে দেশ ও জনগণের স্বার্থে কৃষি, কৃষক ও নদী বাঁচাতে তিস্তা সমস্যার সমাধানের জন্য আমাদেরই বাঁচার পথ খুঁজে নিতে হবে।’
যে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে, প্রায় দশ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থানসহ আধুনিক কৃষির উন্নয়ন, দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম পরিত্যক্ত লালমনিরহাট বিমানবন্দর চালু হওয়ার সম্ভাবনা, চিলমারী নৌবন্দর চালু হওয়ার সম্ভাবনাসহ উত্তরবঙ্গের ভাগ্য উন্নয়নে জাতীয়ভাবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে অগ্রসর হবে বাংলাদেশও। তবুও কেন এ প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখতে পাচ্ছে না। যা দেশবাসীকে হতাশার সাগরে নিমজ্জিত করছে। সকলের প্রত্যাশা, দেশের অর্থনীতির সার্বিক উন্নয়নের কথা চিন্তা করে অতি দ্রুত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হোক।
মো: আকতার হোসাইন
ব্যাংকার ও কলামিস্ট