মো: আকতার হোসাইন:
বাংলাদেশ-ভারত প্রতিবেশী বন্ধুত্বপূর্ণ দুটি রাষ্ট্র হলেও বিগত ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কে বিশাল এক চিড় ধরেছে। নতুন করে দিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনকে ঘিরে ঢাকার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বার্তা এসেছে দুই দেশের তরফ থেকে। বর্তমান সময়ে সে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের জন্য দুই দেশ চেষ্টা চালাচ্ছে। বাংলাদেশের নীতি হওয়া উচিত-বন্ধুত্ব সবার সঙ্গে, নির্ভরতা কারও ওপর নয়; বিরোধ যেখানে আছে সেখানে ন্যায্য দর-কষাকষি, আর স্বার্থ যেখানে মেলে সেখানে সহযোগিতা। আজ ভারতের স্বার্থে চাপ তৈরি হয়েছে বলেই ভারত নিজ থেকেই বাংলাদেশের সরকারপ্রধানকে ভারত সফরের জন্য বারবার আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। অর্থাৎ বাংলাদেশকে এখন একটু হলেও সমীহ করার চেষ্টায় রয়েছে। যা উভয় দেশের জন্যই গুরুত্ব বিবেচনায় অত্যন্ত সময়োপযোগী ও সহায়ক কর্মপন্থা। কারণ ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ দুই রাষ্ট্রকেই একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়।ঐতিহাসিক ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একপ্রকার প্রতিহিংসার মনোভাব পরিলক্ষিত হচ্ছিল। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ সরকার প্রথমবারের মতো ভারতের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে কথা বলার মতো সাহস করছে । জুলাই-পরবর্তী ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে উচ্চারিত কণ্ঠস্বর তরুণ প্রজন্মের ওসমান হাদীর গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনায় অভিযুক্ত দুই হত্যাকারী ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর ২০২৬ সালের মার্চে পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তার হয়েছে। অভিযুক্ত হত্যাকারীদের বাংলাদেশ ফেরত চাইলেও ভারত সরকার তাদের ফেরত দেওয়ায় গরিমসি শুরু করেছে। আবার ময়মনসিংহে পোশাক কারখানার শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসের নির্মম হত্যাকাণ্ডকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন হিসেবে দেখাতে চেয়েছিল ভারত, এমনটাই গুঞ্জন ছিল সেই সময়। এছাড়াও ভারতের মিডিয়াগুলোর অতিরঞ্জিত মিথ্যাচার, সংবাদ ও উদ্ভট আচরণের ফলে ভারত-বাংলাদেশের উষ্ণ সম্পর্কে চিড় ধরেছিল। ফলশ্রুতিতে দুই দেশের মধ্যে একপ্রকার আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল। এখন সেই আস্থা ফেরানোর জন্যই ভারত সরকার নিজে থেকেই বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। কিন্তু সেখানেও বাদ সেজেছে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে।এ পর্যন্ত ভারত মনে করত, তারা আমাদের করুণা করছে। কথায় কথায় আলু, পেঁয়াজ বন্ধ করতে চেয়েছিল। ভারত হয়তো ভুলেই গিয়েছিল, তাদের কৃষিপণ্যের বড় বাজার এই বাংলাদেশ। বাংলাদেশ তার আমদানির জন্য বিকল্প রাষ্ট্র যদি পেয়ে যেত, ভারত কি পারত বাংলাদেশের বিকল্প খুঁজে পেতে? তার কত লোক বেকার হবে? কারণ অক্টোবর ২০২৪ সালে ভারতের খুচরা মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ২ শতাংশ এবং ২০২৫ সালের অক্টোবরে ০ দশমিক ২৫ শতাংশে অবস্থান করছিল। আবার খাদ্যে মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ এবং এক বছর পর ওই মূল্যস্ফীতিই হয়েছিল ঋণাত্মক ৫ দশমিক ০২ শতাংশ। এর অর্থ হলো, ভারত তার বড় কৃষিপণ্যের বাজার বাংলাদেশে রপ্তানি করতে পারছিল না। তাই এমন মূল্যস্ফীতি। ভারতের জন্য এটি একটি শিক্ষণীয় ছিল বলেই আজ হয়তো বোধোদয় হয়েছে।গত ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশ সাড়ে ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আমদানি করে, যার মধ্যে চাল আমদানি করে দেড় কোটি, আলু ১৭ লাখ, পেঁয়াজ-রসুন ২০ কোটি মার্কিন ডলার এবং বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স যায় ভারতে। পর্যটন শিল্প ও চিকিৎসার মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশ থেকে প্রচুর রেমিট্যান্স আহরণ করে থাকে। সুতরাং ভারতের অর্থনীতি বাংলাদেশের ওপর অনেক ক্ষেত্রেই নির্ভরশীল।বাংলাদেশ জন্মলগ্ন থেকে ভারতের ওপর নির্ভরশীল ছিল, আজও তা বিদ্যমান থাকলেও তা অনেকাংশে কমে এসেছে। এভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে খুব সহজেই ভারতনির্ভরতা আরও কমে যাবে। যা ভারতের রপ্তানি বাণিজ্যে স্বল্পমেয়াদি প্রভাব না পড়লেও এর দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রভাব পড়বে বলে বিশেষজ্ঞদের মত। আরও একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য হলো, ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থানরত বৈধ বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা ১ লাখ ৭ হাজার ১৬৭ জন, এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে ভারতীয় নাগরিক ৩৭ হাজার ৪৬৪ জন (সূত্র: স্পেশাল ব্রাঞ্চ ও সুরক্ষা সেবা বিভাগ)। যারা সুপার ম্যানেজার বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে আমাদের দেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ শিল্প ও কর্পোরেট জগতে কাজ করে প্রতি বছর আমাদের দেশ থেকে ৫০০ থেকে হাজার কোটি মার্কিন ডলার তাদের দেশে নিয়ে যাচ্ছে ভারত। ভারত হয়তো এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশকে বন্ধু ভেবে বন্ধুর পাশে থাকার আহ্বান জানাচ্ছে এবং বন্ধু রাষ্ট্রের প্রতি আন্তরিক হওয়ার চেষ্টায় আছে। কারণ হলো, বাংলাদেশের যেমন ভারতকে প্রয়োজন, ঠিক তেমনি ভারতেরও বাংলাদেশকে প্রয়োজন।এককভাবে ভারতের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বিকল্প খুঁজতে হবে বাংলাদেশকে। এই বিকল্প হতে পারে চীন, মিয়ানমার, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান ও তুরস্ক। চীন হতে পারে সবচেয়ে বড় বিকল্প। কারণ কৃষি ও চিকিৎসার জন্য চীনের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। চীনের একটি বড় সমস্যা হলো ভাষা ও খাবার। চীনের সঙ্গে বা চীনের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের সমস্যা নিয়ে কথা বলে সুবিধা চাইতে পারি। তবে একটি বিষয় না বললেই নয়, তা হলো বাংলাদেশের পরিসংখ্যান বলছে, দেশে উৎপাদিত আলু, পেঁয়াজ ও চালের চাহিদা মেটানো সম্ভব। শুধু দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও সৎ লোকের প্রয়োজন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ যদি না হয়। এভাবে চললে ভারত আরও নমনীয় হবে, এমনটাই মনে করেন অনেকে।ভারত বাংলাদেশকে ছোট করে না দেখে বা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য না করে হাতে হাত রেখে, পরস্পরকে সাহায্য-সহযোগিতা এবং বন্ধুত্বের হাত বাড়ালেই বরং উভয়ের জন্য মঙ্গল হবে। ভারত দক্ষিণ এশিয়ার তথা বিশ্ব মোড়ল হতে চাইলে, ভারতকে অবশ্যই বাংলাদেশকে পাশে রাখতে হবে এবং তাদের অর্থনীতি অনেক বড় হলেও বাংলাদেশের ওপর অনেক ক্ষেত্রেই অনেক বেশি নির্ভরশীল। অপরদিকে, বাংলাদেশকেও অর্থনীতিকে আরও মজবুত করতে হলে অবশ্যই ভারতকে পাশে দরকার। কারণ ভারতের রপ্তানি বাণিজ্যের বাজারের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮ নম্বরে এবং প্রায় নয় শত কোটি মার্কিন ডলারের বাজার এটি। যা ভারতের মোট রপ্তানির প্রায় ১৪ শতাংশের বেশি। অপরদিকে, বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের বাজারের মধ্যে ভারতের অবস্থান নবম স্থানে এবং প্রায় ১৫৭ কোটি মার্কিন ডলারের বাজার এটি। যা বাংলাদেশের মোট রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৩.৭৫ শতাংশ (তথ্য: ইপিবি ও ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়)।তবে বর্তমান সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সরকারের পক্ষ থেকে দুই দিনের দিল্লি সফর আয়োজনের প্রস্তাব রয়েছে। সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ‘সহায়ক পরিবেশ’ চায় ঢাকা, আবার দিল্লিও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগ্রহ দেখাচ্ছে। যেখানে আলোচনা হতে পারে বাণিজ্য, ট্রানজিট, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও গঙ্গার পানিবণ্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ এ বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ায় এটি নবায়নের জন্য বেশ মুখিয়ে থাকবে বাংলাদেশ। আবার তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তিও এখনও সম্ভব হয়নি।সুতরাং প্রয়োজনীয়তা উভয়েরই রয়েছে। ভারতকে মনে করতে হবে, বাংলাদেশ বন্ধু রাষ্ট্র এবং উত্তম প্রতিবেশী। এছাড়াও দেশ দুটির মধ্যে রয়েছে সংস্কৃতি, ভাষাগত, মানুষে মানুষে বন্ধুত্বের মেলবন্ধন এবং ভৌগোলিকভাবে অখণ্ডতা, যা দেশ দুটির মধ্যে বন্ধুত্বের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। নিঃসন্দেহে বলা যায়, বাংলাদেশকে যেমন ভারতের প্রয়োজন, তেমনি ভারতেরও বাংলাদেশকে প্রয়োজন।