আধুনিক যুগেও মাটিতে আঁকা ঘরে খেলায় মেতে ওঠেন তারাগঞ্জের মানুষ

অনন্য রহমান:

রাস্তার পাশে বসেই দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর লড়াই, বুদ্ধি-কৌশল আর ধৈর্যের খেলায় মেতে ওঠেন বৃদ্ধ থেকে তরুণ, স্থানীয়দের কাছে যা ‘পাইত’ বা ‘ষোল গুটি’ খেলা নামে পরিচিত।
গ্রামের আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে যাওয়ার সময় হঠাৎ চোখে পড়ল রাস্তার পাশে মাটিতে বসে থাকা কয়েকজন বয়স্ক মানুষ। চারপাশে কোনো আয়োজন নেই, নেই কোনো মাঠ বা খেলাধুলার সরঞ্জাম। তবুও তাদের চোখেমুখে ছিল গভীর মনোযোগ। কেউ একজন মাটির ওপর আঁকা ঘরের দিকে তাকিয়ে আছেন, আবার কেউ হাতে থাকা ছোট ছোট গুটি সরিয়ে দিচ্ছেন।
রাস্তার পাশে মাটিতে বসে তারা আসলে কী করছেন? কৌতূহল সামলাতে না পেরে কাছে গিয়ে এক বৃদ্ধকে জিজ্ঞাসা করা হলো,
কি ব্যাহে, কি খেলায়ছেন? মৃদু হেসে বৃদ্ধের উত্তর, ৩২ গুটি খেলা খেলাইছি।
বৃদ্ধের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তারাগঞ্জের গ্রামীণ জনপদে ৩২ গুটি শুধু একটি খেলা নয়, এটি অনেকের কাছে অবসর কাটানোর আনন্দ, আড্ডার উপলক্ষ এবং পুরোনো দিনের স্মৃতিকে ধরে রাখার একটি মাধ্যম।
তাদের মতে, তারাগঞ্জের অনেক মানুষ অবসর সময়ে ৩২ গুটি খেলতে বসেন। বিশেষ করে বয়স্কদের কাছে খেলাটি বেশ জনপ্রিয়। শুধু বয়স্করাই নন, নতুন প্রজন্মের অনেক তরুণও এই খেলায় আগ্রহ দেখান।
এটি এমন একটি খেলা, যেখানে শুধু গুটি সরালেই হয় না; প্রতিটি চাল দেওয়ার আগে ভাবতে হয় প্রতিপক্ষ কী চাল দিতে পারেন। ফলে খেলাটিতে প্রয়োজন হয় বুদ্ধি, ধৈর্য, কৌশল ও সতর্কতার।
অনেকটা নীরব লড়াইয়ের মতো। দুজন খেলোয়াড় মুখোমুখি বসে থাকেন, কিন্তু তাদের আসল প্রতিযোগিতা চলে মাটির ওপর আঁকা ঘর আর গুটির চালের মধ্যে।
স্থানভেদে এই ঐতিহ্যবাহী খেলাটির নামেও রয়েছে ভিন্নতা। তারাগঞ্জের স্থানীয়দের কাছে এটি ‘৩২ গুটি’ নামে পরিচিত হলেও অনেকের মুখে শোনা যায় ‘পাইত খেলা’ কিংবা ‘ষোল গুটি খেলা’ নামও।
নাম ভিন্ন হলেও খেলার মূল আনন্দ একই প্রতিপক্ষের গুটি কৌশলে কেটে নিজের গুটি দিয়ে জয় নিশ্চিত করা।
এই খেলার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো এর উপকরণ খুবই সহজলভ্য। আধুনিক কোনো বোর্ড বা দামি সরঞ্জামের প্রয়োজন হয় না। সাধারণত মাটিতে দাগ কেটে তৈরি করা হয় খেলার ঘর। এরপর দুই খেলোয়াড়ের জন্য আলাদা আকৃতি, ফলের বিচি কিংবা ইট / কাঠের টুকরো কে গুটি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
দুই প্রতিদ্বন্দ্বী খেলোয়াড়ের প্রত্যেকের থাকে ১৬টি করে গুটি। অর্থাৎ দুই পক্ষ মিলে মোট ৩২টি গুটি নিয়ে শুরু হয় খেলা। মাটিতে আঁকা ঘরগুলোই হয়ে ওঠে তাদের খেলার বোর্ড। আর সেই বোর্ডের প্রতিটি দাগ ও ঘরকে কেন্দ্র করেই চলে একের পর এক চাল।
খেলার নিয়ম অনুযায়ী, গুটিগুলো নির্দিষ্ট দাগ ও ঘর ধরে চাল দিতে হয়। কোনাকুনি দাগের গুটি কোনাকুনি পথে এবং উলম্ব দাগের গুটি নির্দিষ্ট নিয়মে চাল দেওয়া যায়। প্রতিপক্ষের গুটিকে কৌশলে ডিঙিয়ে যেতে পারলে সেই গুটি কাটা পড়ে। এভাবে একের পর এক প্রতিপক্ষের গুটি কমিয়ে আনাই খেলোয়াড়ের মূল লক্ষ্য। শেষ পর্যন্ত যে খেলোয়াড় প্রতিপক্ষের সব গুটি কেটে ফেলতে পারেন, তিনিই হন বিজয়ী।
গ্রামবাংলার অনেক ঐতিহ্যবাহী খেলা সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেলেও ৩২ গুটি এখনো টিকে আছে মানুষের আগ্রহে। অনেকেই মনে করেন, এ ধরনের খেলার প্রচলন উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ জনপদে দীর্ঘদিনের। তবে শুধু উত্তরাঞ্চলেই নয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও এই ধরনের খেলা খেলতে দেখা যায়।
সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের বিনোদনের ধরনও। প্রযুক্তির এই যুগে ৩২ গুটি খেলা আর শুধু গ্রামের মাটির ঘরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। মোবাইল ফোনের বিভিন্ন সফটওয়্যার বা গেমের মাধ্যমেও এখন এই ধরনের খেলা খেলার সুযোগ রয়েছে। প্রযুক্তির হাত ধরে খেলাটি পৌঁছে গেছে নতুন প্রজন্মের কাছেও।
তারাগঞ্জের রাস্তার পাশে সেই বৃদ্ধদের খেলা দেখতে দেখতে মনে হলো এটি শুধু দুইজন মানুষের সময় কাটানোর খেলা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামবাংলার আড্ডা, শৈশবের স্মৃতি, বুদ্ধির লড়াই এবং একসময়ের নির্মল বিনোদনের গল্প।আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিনোদনের ধরন পাল্টালেও মাটিতে দাগ কেটে, ১৬টি করে গুটি সাজিয়ে মুখোমুখি বসে খেলার সেই আনন্দ এখনো কিছু মানুষের কাছে অমলিন।
কারণ কিছু খেলা শুধু খেলা নয় সেগুলো একটি অঞ্চলের মানুষের স্মৃতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *