বাকৃবি প্রতিনিধি:বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুজ্জামান পরিবেশ সংরক্ষণে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্র্যাক ব্যাংক-তরুপল্লব প্রবর্তিত ‘দ্বিজেন শর্মা পরিবেশ পদক-২০২৫’ অর্জন করেছেন। বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ সংরক্ষণ, পরিবেশবিষয়ক গবেষণা এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অবদানের জন্য তিনি ‘নিসর্গ পুরস্কার’ ক্যাটাগরিতে এ সম্মাননা লাভ করেন।
গত ১০ জুলাই ঢাকার বাংলা একাডেমিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুজ্জামানের হাতে পদক তুলে দেন।
দীর্ঘদিন ধরে তিনি বাংলাদেশের বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ প্রজাতির সংরক্ষণ, উদ্ভিদসম্পদের সম্প্রসারণ এবং প্রকৃতি সংরক্ষণে গবেষণা ও কাজ করে আসছেন। তাঁর উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন বনাঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা প্রায় ১,৮০০ প্রজাতির উদ্ভিদ একটি বোটানিক্যাল গার্ডেনে সংরক্ষণ করা হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতিও রয়েছে।
বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ ও গাছের চারা উৎপাদন করে সেগুলো শিক্ষাবিদ, গবেষক, কৃষকদের মধ্যে বিতরণের মাধ্যমে তিনি এসব প্রজাতি বিলুপ্তির হাত থেকে থেকে রক্ষার উদ্যোগ নিয়েছেন। পাশাপাশি প্রায় ৫০০ প্রজাতির ঔষধি উদ্ভিদ নিয়ে একটি সমৃদ্ধ সংগ্রহশালা গড়ে তুলেছেন, যা ঐতিহ্যবাহী ভেষজ জ্ঞান সংরক্ষণ, গবেষণা ও শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এছাড়া ৭০টিরও বেশি প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ সংরক্ষণের মাধ্যমে জলাশয়ের বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং পানির গুণগত মান উন্নয়নেও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। এছাড়া দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য জার্নালে তাঁর ১২০টিরও বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে।
তিনি বাকৃবির বোটানিক্যাল গার্ডেনের কিউরেটর এবং কৃষি জাদুঘরের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে কৃষি জাদুঘরটি একটি জীবন্ত শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এখানে বিরল উদ্ভিদ সংগ্রহ, ঔষধি বাগান এবং জলজ উদ্ভিদ সংরক্ষণ শিক্ষার্থী, গবেষক ও পর্যটকদের জন্য প্রকৃতি-জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে জানার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে।
পুরস্কারপ্রাপ্তির অনুভূতি প্রকাশে অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, ‘দ্বিজেন শর্মা পরিবেশ পদক ২০২৫’-এর ‘নিসর্গ পুরস্কার’ ক্যাটাগরিতে মনোনীত করায় হয়ে আমি আয়োজকবৃন্দর প্রতি কৃতজ্ঞ একই সাথে অত্যন্ত অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত বোধ করছি। এ পুরস্কারপ্রাপ্তি আমার নিবেদিত কাজের এক স্বীকৃতি, যা কাজের প্রতি আমাকে আরও দায়বদ্ধ করে দিলো। এমন কাজ চলমান থাকবে ও এগিয়ে নিয়ে যাবো। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এই দায়িত্ব পৌঁছে দিতে আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করে যাবো।’
কাজের মূল্যায়ন তিনি বলেন, ‘আমি মূলত বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ প্রজাতি সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ করার চেষ্টা করছি। বন-জঙ্গল উজাড় হয়ে যাওয়ার ফলে যেসব প্রজাতি হারিয়ে যাচ্ছে, সেগুলোকে প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা করছি। বাকৃবির বোটানিক্যাল গার্ডেনে এ পর্যন্ত ১৮০০ অধিক বেশি প্রজাতির গাছ নিজ উদ্যোগে সংগ্রহ করেছি। যার মধ্যে অনেকগুলোই এখন আর প্রাকৃতিক পরিবেশে পাওয়া যায় না।’
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি বার্তায় তিনি বলেন, ‘গাছের প্রতি আমাদের আরও যত্নশীল হতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় গাছ নিধন বন্ধ করতে হবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে। প্রকৃতিকে ভালোবাসা এবং সংরক্ষণ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক সুন্দর ও বাসযোগ্য পৃথিবী পাবে। সত্যি বলতে প্রকৃতি নিয়ে কাজ করে তারা সাধারণত কোনো খারাপ কাজ করতে পারে না।’