বাকৃবিতে একের পর এক চুরি-ছিনতাই, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন শিক্ষার্থীদের

বাকৃবি প্রতিনিধি:

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একাধিক আবাসিক হলে গত কয়েকদিনে পরপর চুরির অভিযোগ উঠেছে। একই সময়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানেও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ক্যাম্পাসের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে আবাসিক হলগুলোর পেছনের অংশ, প্রবেশপথ ও জানালার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। 

গত রোববার (৩০ আগস্ট) রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের ‘ডি’ ব্লকের তৃতীয় তলায় একাধিক কক্ষে চুরির অভিযোগ পাওয়া যায়। ওই হলের শিক্ষার্থীরা জানান, রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে এসব ঘটনা ঘটে। পরে আরও একটি কক্ষে চুরির চেষ্টা করার সময় কক্ষের বাসিন্দার নজরে পড়লে ওই ব্যক্তি পালিয়ে যান। এ সময় তার জুতা ও কিছু আলামত ঘটনাস্থলে পড়ে থাকে।

ফজলুল হক হলের শিক্ষার্থী সোয়াইব বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য হলের পেছনের অংশ নিয়মিত পরিষ্কার করা প্রয়োজন। দেওয়ালের কাঁটাতার দ্রুত মেরামত করতে হবে। পুরো হলকে সিসিটিভির আওতায় আনার পাশাপাশি পেছনের গেটে সার্বক্ষণিক একজন নিরাপত্তাকর্মী রাখার দাবি জানান তিনি।

এদিকে একই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে শহীদ শামসুল হক হলের ‘এ’ ব্লকের তৃতীয় তলা থেকে এক ব্যক্তিকে আটক করেন শিক্ষার্থীরা। পরে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর আগে গত ৪ আগস্ট রাত সাড়ে ৭টা থেকে সাড়ে ৮টার মধ্যে হলের ‘সি’ ব্লকের পেছন দিয়ে এক ব্যক্তি প্রবেশ করেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে বাথরুমের পাইপ বেয়ে উঠে পেছনের জানালা দিয়ে ২২৮ নম্বর কক্ষ থেকে টেবিলে রাখা একটি স্মার্টফোন নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

শামসুল হক হলের শিক্ষার্থী দিগন্ত বলেন, হলে কার্যকর সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা জরুরি। বিশেষ করে হলের পেছনের অংশ দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তাহীন। ওই অংশের বাউন্ডারি টপকে সহজেই হলে প্রবেশ করা সম্ভব। তাই সেখানে নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।

এদিকে গত ২২ আগস্ট মাওলানা ভাসানী হলে ‘এ’ ব্লকের ১০৫ নম্বর কক্ষে থাকা নেপালি শিক্ষার্থীদের দুটি ফোন চুরির অভিযোগ পাওয়া যায়। এর মধ্যে একটি ফোন ২৪ আগস্ট অজ্ঞাতভাবে ফেরত পাওয়া গেলেও ওই শিক্ষার্থীদের মানিব্যাগ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এরপর গত ২৭ আগস্ট একই ব্লকের ১০৪ নম্বর কক্ষ থেকেও একটি ফোন চুরির অভিযোগ পাওয়া যায়।

মাওলানা ভাসানী হলের শিক্ষার্থী জায়েদ মন্ডল বলেন, হলে পর্যাপ্ত সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি নিরাপত্তাকর্মীদের আরও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের গাফিলতি থাকলে চুরির ঝুঁকি বাড়ে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এছাড়া গত ৩০ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেন ও বৈশাখী চত্বরে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। পরে পৃথক অভিযান চালিয়ে দুই স্থান থেকে একাধিক ব্যক্তিকে আটক করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি।

পরপর এসব ঘটনায় আবাসিক হলগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী ও নিয়মিত নজরদারির ঘাটতির কারণে হলের বিভিন্ন প্রবেশপথ, পেছনের অংশ ও জানালা দিয়ে অনুপ্রবেশের ঝুঁকি রয়েছে। এসব ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা এ এস এম খায়রুল ফাত্তাহ বলেন, বৈশাখী চত্বর ও বোটানিক্যাল গার্ডেনে ছিনতাইয়ের ঘটনায় একই ব্যক্তি জড়িত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে আগে থেকেই ৭-৮টি মামলা রয়েছে এবং তিনি জামিনে ছিলেন। প্রথম ঘটনার পর পর্যাপ্ত প্রমাণ ও বাদী না থাকায় তাকে অভিভাবকের জিম্মায় ছেড়ে দিতে হয়েছিল। বর্তমানে অপরাধ দমনে প্রক্টর অফিসের সঙ্গে যৌথভাবে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। ক্যাম্পাসে সার্বক্ষণিক টহলের জন্য একটি স্থায়ী পুলিশ টিম মোতায়েনের চেষ্টা চলছে। অনিয়ন্ত্রিত অনুপ্রবেশ বন্ধে স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে জনবল ঘাটতি পূরণ এবং প্রয়োজনীয় গাড়ি ও সিসিটিভি ক্যামেরা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

ফজলুল হক হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. রায়হান হাবিব বলেন, চুরি রোধে শিক্ষার্থীদের সতর্ক করে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। মূল্যবান জিনিসপত্র লকারে তালাবদ্ধ করে রাখার পাশাপাশি বাইরে থেকে হাত বাড়িয়ে নেওয়া যায় এমন স্থানে না রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। হলের পেছনের অন্ধকার জায়গাগুলোতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পুরো পেছনের এলাকা কভার করে এমন একটি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হয়েছে।

শামসুল হক হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. আবুল মঞ্জুর খান বলেন, চুরির ঘটনায় শিক্ষার্থীরা একজনকে আটক করে পুলিশে হস্তান্তর করেছে। পরবর্তী কার্যক্রম পুলিশ পরিচালনা করছে। নিরাপত্তা জোরদারে দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তাকর্মীদের সতর্ক করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। হলে বিভিন্ন ধরনের লোকজনের আসা-যাওয়া থাকায় মনিটরিং সহজ করতে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় সবার নাম খাতায় লিপিবদ্ধ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি একজন নিরাপত্তাকর্মীও বাড়ানো হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. আবদুল আলীম বলেন, সম্প্রতি আবাসিক হলগুলোতে বেশ কিছু চুরির ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি নিয়ে প্রভোস্ট কাউন্সিলের সভায় আলোচনা হয়েছে। গত ৩০ আগস্ট বৈশাখী চত্বর থেকে দুজন এবং পরে বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে আরও দুজনকে আটক করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ক্যাম্পাসে দায়িত্বে থাকা পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মীদের সতর্ক করা হয়েছে। হলগুলোর পেছনের অংশে আলোর স্বল্পতা আছে কি না, তা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। হল প্রশাসনকেও নিজ নিজ দায়িত্বে কোনো ধরনের গাফিলতি না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়ে প্রক্টর বলেন, জব্বারের মোড় থেকে ফার্স্ট গেট পর্যন্ত সড়কে বর্তমানে নির্মাণকাজ চলছে। এ কারণে সড়কের লাইটগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে সন্ধ্যার পর রাস্তাটি অন্ধকার থাকে। সড়কটি সিটি করপোরেশনের আওতাধীন হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সেখানে নতুন করে লাইট স্থাপন করতে পারছে না। শিক্ষার্থীদের সন্ধ্যার পর ঝুঁকিপূর্ণ এসব সড়ক এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিচ্ছি। পাশাপাশি ক্যাম্পাসে সার্বক্ষণিক টহল জোরদার করা হয়েছে।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *