নতুন প্রজাতির সাদামাছি শনাক্ত করলেন বাকৃবি গবেষকরা 

বাকৃবি বিশেষ সংবাদদাতা:

বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ‘প্যারালেইরোডিস সিউডোনারাঞ্জি’ (Paraleyrodes pseudonaranjae) নামের একটি নতুন প্রজাতির সাদামাছির উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক। ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকার নারকেলগাছে পাওয়া এই পোকাটির পরিচয় মাঠপর্যায়ের জরিপ, বাহ্যিক গঠন পর্যবেক্ষণ এবং ডিএনএ বারকোডিং বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়।

গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. গোপাল দাস, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তোফাজ্জল হোসেন হাওলাদার, স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী মো. সোহেল রানা ও মোহাম্মদ মাহির উদ্দিন। কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজিএফ) আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত গবেষণাপত্রটি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সাময়িকী ‘ফাইটোপ্যারাসিটিকা’তে প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণার অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের জুন ও ডিসেম্বরে ময়মনসিংহের পাঁচটি এলাকায় নারকেলগাছে সাদামাছির উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে নতুন শনাক্ত প্রজাতিটির আপেক্ষিক উপস্থিতি জুনে ৬ দশমিক ৪০ থেকে ১৪ দশমিক ৬০ শতাংশ থাকলেও ডিসেম্বরে বেড়ে ২৭ দশমিক ৪০ থেকে ৩৬ দশমিক ৪০ শতাংশে দাঁড়ায়। গবেষকদের মতে, এ বৃদ্ধি স্থানীয় পরিবেশে প্রজাতিটির বিস্তারের ইঙ্গিত দিলেও নারকেল উৎপাদনে এর প্রভাব এখনো নিশ্চিত নয়।

গবেষণায় একই গাছে রুগোজ স্পাইরালিং হোয়াইটফ্লাই ও বন্ডারস নেস্টিং হোয়াইটফ্লাই নামে আরও দুটি প্রজাতির উপস্থিতি পাওয়া যায়। নতুন প্রজাতিটির উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে রুগোজ স্পাইরালিং হোয়াইটফ্লাইয়ের উপস্থিতি কমতে দেখা গেছে। গবেষকদের ধারণা, প্রজাতিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকতে পারে। তবে বিষয়টি নিশ্চিত নয়।

নতুন প্রজাতিটির পরিচয় নিশ্চিত করতে বাহ্যিক গঠন ও ডিএনএ বারকোডিং পদ্ধতিতে জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে ভারত ও চীনে শনাক্ত একই প্রজাতির সঙ্গে বাংলাদেশের নমুনার ৯৯ থেকে ১০০ শতাংশ জিনগত মিল পাওয়া যায়। তবে পোকাটি কীভাবে বাংলাদেশে এসেছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

বাকৃবির কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তোফাজ্জল হোসেন হাওলাদার বলেন, ‘নারকেল বাংলাদেশের অন্যতম অর্থকরী ফসল। নতুন নতুন পোকার আক্রমণ নারকেল চাষের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। দেশে সাদামাছির নতুন প্রজাতির উপস্থিতি এবং একই গাছে একাধিক প্রজাতির সহাবস্থান ভবিষ্যৎ গবেষণা ও ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ পরিস্থিতিতে নারকেলগাছের পাতার নিচের অংশ নিয়মিত পরীক্ষা, আক্রান্ত এলাকায় জরিপ এবং সন্দেহজনক পোকার নমুনা বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে শনাক্ত করা জরুরি।’

তিনি আরও বলেন, ‘পোকার বিস্তার রোধে নার্সারি ও চারা পরিবহনে উদ্ভিদ সংগনিরোধ ব্যবস্থা জোরদার এবং কৃষকদের সচেতন করতে হবে। যাচাই ছাড়া কীটনাশক ব্যবহার না করে পরিবেশসম্মত সমন্বিত দমনব্যবস্থা ও জৈবিক নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। আতঙ্ক নয়, দ্রুত শনাক্তকরণ, নিয়মিত নজরদারি ও সমন্বিত উদ্যোগই নতুন সাদামাছির সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলার কার্যকর পথ।’

নতুন প্রজাতিটির বিস্তৃতি, জীবনচক্র ও নারকেল উৎপাদনে সম্ভাব্য প্রভাব নির্ধারণে আরও গবেষণা প্রয়োজন। এ জন্য নারকেল উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি জরিপ, নিয়মিত নজরদারি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে পরিবেশসম্মত দমনপদ্ধতি উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন গবেষকরা।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *