
মো: আকতার হোসাইন
ব্যাংকার ও কলামিস্ট
দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি এককভাবে সংসদে এক-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সরকার গঠন করে। সরকার গঠনের পর স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন জায়গায় রদবদল হবে বা কিছু লোকজনের চাকরিচুত্য হবে, এটা খুবই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত আইএমএফের অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা একজন অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তার এমনভাবে অপসারণ কাম্য ছিল কি না, সেটি এখন সমগ্র দেশে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। গিরিখাতে পড়া দেশের অর্থনীতির এমন নাজুক অবস্থায় একজন ব্যবসায়ীকে এতটাই স্পর্শকাতর একটি পদে আসীন করা কতটা যুক্তিযুক্ত হলো, তা নিয়েই নবগঠিত সরকারের প্রতি মানুষের সমালোচনার তীর ছুড়ছে। এবার আলোচ্য বিষয় হলো আদৌ কি একজন ব্যবসায়ীকে এ দায়িত্ব দেওয়া ঠিক হয়েছে?
প্রথমেই আসা যাক তৎকালীন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরকে নিয়োগ দেওয়ার কারণ এবং এই সময়ে তার সফলতা ও ব্যর্থতার মূল্যায়ন নিয়ে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে অর্থনীতির অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভ কমতে থাকে, ডলারের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে এবং ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি সরকারও বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল, গ্যাসসহ বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দাম বাড়িয়ে দেয়। সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতি লাগামছাড়া হয়ে পড়ে। যেমন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২৩ সালের আগস্টে যেখানে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছিল, অথচ তা দ্রুত কমে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মাত্র ২০ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। ডলারের বাজারদর ২০২২ সালে যেখানে ছিল এক ডলার সমান ৮৭ টাকা, সেখান থেকে দ্রুত অবমূল্যায়নের (ডিপ্রিসিয়েশন) মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এক ডলারের দাম দাঁড়ায় ১২৫ টাকা। দেশের বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশসহ বেশ কিছু ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল। শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি তাদের গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করে দাবি করেছে যে শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের লুটপাটতন্ত্রের ফলে দেশের অর্থনীতি থেকে প্রতিবছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার করে মোট ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে খেলাপি ঋণ লুকিয়ে রাখার প্রবণতা ছিল অনেক বেশি। আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ করে জাতির কাছে তুলে ধরেন। তিনি খেলাপি ঋণের সংজ্ঞাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতের ৩৬ শতাংশ বা ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে অর্থ ফেরত দিতে না পারা ইসলামী ধারার পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করেছিলেন। এর বাইরে আরও অনেক ব্যাংক থেকে গ্রাহকেরা টাকা তুলতে পারছেন না। এ ছাড়া ছয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়েছে। খেলাপি ঋণের বড় অঙ্কের অর্থ পাচার হয়ে গেছে। এসব অর্থ উদ্ধারে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে ব্যাংকগুলো। তিনি তাঁর নিয়ম-নীতির ক্ষেত্রে কঠোর ছিলেন। নতুন করে টাকা ছাপিয়ে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা দেওয়া প্রায় বন্ধই করে দিয়েছিলেন। যার ফলে একদিকে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত চিত্র সামনে আসে, অন্যদিকে কঠোর মুদ্রানীতির কারণে মূল্যস্ফীতিও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকে। তবে বেকারত্ব কিছুটা বেড়ে যায়। এসব কারণে ক্ষমতাসীন ব্যাংক মালিকরা তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন। এটি কি তারই বহিঃপ্রকাশ?
অপরদিকে, ১৪তম গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনার লক্ষ্যে গঠিত বিএনপির ৪১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির ২৩তম সদস্য এবং হেরা সোয়েটার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলকারী মো. মোস্তাকুর রহমান। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একটি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ অনুযায়ী মোস্তাকুর রহমানকে অন্যান্য সব প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে কর্মসম্পর্ক পরিত্যাগের শর্তে যোগদানের তারিখ থেকে চার বছরের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। তবে বর্তমান গভর্নর সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে হেরা সোয়েটার্সের ৮৬ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। ঋণটি খেলাপিতে পরিণত হয়েছিল। বিশেষ সুবিধার আওতায় গত বছরের জুনে তা পুনঃতফসিল করা হয়। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী বিজিএমইএ, আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাব, অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব) এবং ঢাকা চেম্বারের সদস্য ছিলেন এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেডেও কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। এখানে আমাদের দীনের নবীর একটি হাদিস উল্লেখ না করলেই নয়। একজন মহিলা তাঁর ছোট ছেলেকে নিয়ে মহানবী হযরত (সা.) এর কাছে আসেন। তিনি বলেন, “ইয়া রাসুলুল্লাহ, আমার ছেলে বেশি বেশি মিষ্টি খায়। আপনি তাকে একটু নিষেধ করে দিন।” নবীজি (সা.) তখন সঙ্গে সঙ্গে কিছু না বলে মহিলাকে বলেন, “তুমি এক সপ্তাহ পর আবার তাকে নিয়ে আসো।”এক সপ্তাহ পর মহিলা আবার ছেলেকে নিয়ে এলেন। তখন নবীজি (সা.) ছেলেটিকে স্নেহভরে বললেন, “বাবা, বেশি মিষ্টি খাবে না। এটা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়।” মহিলা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসুলুল্লাহ, আপনি আগের দিনই তো এটা বলতে পারতেন। এক সপ্তাহ অপেক্ষা করালেন কেন?” তখন তিনি উত্তরে বললেন, “গত সপ্তাহে আমিও মিষ্টি খেতাম। আগে নিজে তা ছাড়লাম, তারপর তাকে বললাম।” অর্থাৎ তিনি নিজেই একজন ঋণগ্রহীতা এবং খেলাপি হওয়ার অভিজ্ঞতাও তাঁর রয়েছে। এমতাবস্থায় এমন একটি স্পর্শকাতর পদে তাঁর অবস্থান সবচেয়ে বেশি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তবে তামিল সিনেমা গীতা ম্যাডাম-এর একটি দৃশ্যে দেখা যায়, ফাঁকিবাজ হলেও নেতৃত্বগুণসম্পন্ন একজন শিক্ষককে স্কুলের স্পোর্টস ম্যানেজারের দায়িত্ব দেওয়ার ফলে সেই স্কুল আন্তঃজেলা প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করে। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য যদি তেমন কিছু হয়ে থাকে, তাহলে তা নিঃসন্দেহে ভালো।
বাস্তবতা হলো, একজনের সাফল্য পরবর্তী জনের জন্য চ্যালেঞ্জ। অভ্যুত্থান-পরবর্তী বেসামাল অর্থনীতি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠার কথা ছিল; সেই বেপরোয়া ধারা রোধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। বর্তমান গভর্নর কি তা ঠেকাতে পারবেন? কারণ তিনি ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই দুটি ব্যাংকে তারল্য সহায়তা দিয়েছেন, যা অর্থনীতির জন্য সুখকর নয়। যদিও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, পরিবর্তন তো শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকে হয়নি, পরিবর্তন অনেক জায়গায় হচ্ছে। এবং এটা তো হতেই থাকবে। তিনি বলেন, ‘নতুন সরকারের যে প্রোগ্রাম আছে, প্রেফারেন্স আছে, চিন্তা আছে, ভাবনা আছে, সবকিছুর সাথে মিলিয়ে এগুলো বাস্তবায়নের জন্য যেখানে যেখানে প্রয়োজন সেখানে তো পরিবর্তন হবেই।’ দিনশেষে দেশের মঙ্গল সবাই চায়। দেশের মঙ্গল কামনায় সবাই অধীর আগ্রহে আছেন; কবে দেশ অর্থনৈতিক টানাপোড়েন থেকে মুক্তি পাবে। দেশের জনগণ আলেয়ার পেছনে নয়, আলোর পেছনে ছুটতে চায়।