রাষ্ট্রের ভিতর আরেক রাষ্ট্র, সত্যিই কি তাই?

মো: আকতার হোসাইন // ব্যাংকার ও কলামিস্ট :

বিশ্বের মেগাসিটিগুলোর মধ্যে এবং দূষিত শহরগুলোর তালিকায় অন্যতম একটি শহর হলো ঢাকা। এই জনবহুল, ঘনবসতিপূর্ণ ও ব্যস্ততম শহরের এক প্রান্তে গড়ে উঠেছে সম্পূর্ণ নিরিবিলি, সবুজে আচ্ছাদিত ও পরিকল্পিত একটি আবাসিক এলাকা—নাম তার বসুন্ধরা। এটি প্রায় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপদ একটি আবাসিক এলাকা; যেখানে রয়েছে বসবাস-উপযোগী, কোলাহলমুক্ত ও তুলনামূলক দূষণমুক্ত পরিবেশ। এখানে রয়েছে নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস এবং নামিদামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সত্যিই যেন রাষ্ট্রের ভিতর আরেকটি রাষ্ট্র, যে রাষ্ট্র অনেকের কাছেই কাম্য।
পৃথিবীতে একই সঙ্গে সুখ ও শান্তি সবসময় মেলে না। শান্তি কখনো কেনা যায় না, তবে অর্থ দিয়ে কিছুটা সুখ ধারণ করা সম্ভব। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও প্যাডেলচালিত রিকশার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ব্যাটারিচালিত রিকশায় উঠে অনেক সময় মানুষ শঙ্কিত বা আতঙ্কিত বোধ করে, কিন্তু প্যাডেলচালিত রিকশায় এক ধরনের স্বস্তি অনুভূত হয়। সেখানে রিকশাচালক পরিশ্রমের বিনিময়ে আপনাকে সেবা দিচ্ছে, আর আপনি সেই সেবার বিনিময়ে স্বস্তি পাচ্ছেন। ঠিক তেমনি বসুন্ধরার ভেতরে রয়েছে প্যাডেলচালিত নিজস্ব রিকশা ব্যবস্থা। এসব রিকশা নির্ধারিত ভাড়ায় পরিচালিত হয়; অতিরিক্ত বা কম ভাড়ার সুযোগ নেই। নেই কোনো বিশৃঙ্খল জটলা, আছে শুধু সুশৃঙ্খল পরিবেশ। এখানে বসুন্ধরা আপনার অর্থের বিনিময়ে আপনাকে স্বস্তি ও নিরাপত্তা দিচ্ছে, আর সেই দায়িত্বও তারাই বহন করছে।
আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যায়। আপনি যদি কোথাও জমি কিনে ভবন নির্মাণ শুরু করেন, অনেক সময় বিভিন্ন ব্যক্তি চাঁদা দাবি করতে পারে কিংবা বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে নির্মাণসামগ্রী কিনতে বাধ্য করতে পারে। এমনকি নির্মাণসামগ্রী চুরি হওয়ার ভয়ও থাকে। কিন্তু বসুন্ধরার ভেতরে তুলনামূলক নিরাপদ পরিবেশে আপনি আপনার কাঙ্ক্ষিত ভবন নির্মাণ করতে পারেন। বিনিময়ে আপনাকে কিছু ফি দিতে হয়। এটিকে ফি বলছি এই কারণে যে, এর বিনিময়ে আপনি মানি রিসিপ্ট পান। অন্যত্র যেসব অর্থ আদায় করা হয়, সেগুলোর ক্ষেত্রে অনেক সময় কোনো রসিদও দেওয়া হয় না। সুতরাং এখানে অর্থের বিনিময়ে আপনি নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশে ভবন নির্মাণের সুযোগ পাচ্ছেন, যা বাংলাদেশের অন্য অনেক স্থানে বিরল।
বসুন্ধরার নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তার একটি বাস্তব ঘটনার সাক্ষী আমরা ছিলাম। সম্ভবত ২০১৯ সালের ঘটনা। আমাদের এক কাস্টমার ব্যাংকে টাকা জমা দিতে যাওয়ার সময় ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন। ছিনতাইকারী টাকার ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর জানা যায়, বসুন্ধরার গেটে নিরাপত্তারক্ষীরা তাকে আটক করেছে। পরে ওই কাস্টমার নিজেও আমাদের বিষয়টি জানান। নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই বসুন্ধরা নিজস্ব কেবল সংযোগ ব্যবস্থাও গড়ে তুলেছে, যাতে বাইরের লোকজনের অবাধ যাতায়াতের কারণে বাসার নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়। যদিও অনেকে এটিকে বসুন্ধরা গ্রুপের নিজস্ব ব্যবসায়িক কৌশল হিসেবে দেখেন, তবে এখানে নিরাপত্তাকেই প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
আপনি যদি পরিসংখ্যান বিবেচনা করেন, তাহলে দেখতে পাবেন গুলশান, বনানী বা বারিধারার মতো অভিজাত এলাকাগুলোতে যেসব চুরি বা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে, তার তুলনায় বসুন্ধরায় এমন ঘটনা তুলনামূলক কম। তাই যদি কেউ অর্থের বিনিময়ে স্বস্তি ও নিরাপত্তা খোঁজেন, তাহলে তিনি হয়তো প্রথমেই বসুন্ধরাকে বেছে নেবেন। এ কারণেই অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বড় ব্যবসায়ী, এমনকি এমপি-মন্ত্রীরাও এখানে বসবাস করেন।
ঢাকার অন্যান্য অভিজাত এলাকায় সকালে ঘুম ভাঙতে পারে হকারের হাঁকডাকে বা ভিক্ষুকের কলিংবেলে। কিন্তু বসুন্ধরার ভেতরে এমন দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়। এমনকি একজন মুরগি বিক্রেতাও সহজে ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। মুরগি কিনতে হলে আপনাকে বাইরে থেকে কিনতে হবে অথবা নির্দিষ্ট সুপারশপের ওপর নির্ভর করতে হবে। এটিকে কেউ সাময়িক অসুবিধা বলতে পারেন, কিন্তু এর পেছনেও রয়েছে নিরাপত্তার বিষয়টি। পৃথিবীতে কোনো কিছুই একতরফা নয়; বিনিময় ব্যবস্থা থাকবেই। তাই এখানে সাময়িক কিছু সীমাবদ্ধতার বিনিময়ে মানুষ নিরাপত্তাকে বেছে নিচ্ছে।
সামান্য ফির বিনিময়ে যদি কেউ স্বস্তি ও নিরাপত্তা পায়, তাহলে অর্থকে অনেকেই দ্বিতীয় স্থানে রাখবেন। আমার নিজে বসুন্ধরায় পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, এটি সত্যিই এক ভিন্ন বাংলাদেশ। এখানে চুরি, ছিনতাই, এমনকি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও তুলনামূলক কম। নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার কারণেই হয়তো এটি সম্ভব হয়েছে। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা এতটাই পরিকল্পিত যে এখানে যানজটও তুলনামূলক কম। অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সবাইকে আইন মেনে চলতে হয়। এর একটি বড় কারণ হলো নিজস্ব রিকশা ব্যবস্থা। যদিও রিকশাচালকদের নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি বা চাঁদা দিতে হয়, তবুও তাদের আয় মোটামুটি সন্তোষজনক হয়ে যায়।
তবে সরকারি যদি এখান থেকে আয় অর্জন করার প্রয়োজন বোধ করে, সেটি সরকার চাইলে করতেই পারে, কিন্তু বসুন্ধরার সৌন্দর্য বিঘ্ন ঘটানো সমনচীন হবে বলে মনে করেন না অনেকেই। তাই এটিকে এর স্বকীয়তা হরণ না করে আরও পরিকল্পিত ভাবে, যা অত্যন্ত সু পরিকল্পিত কল্পনার মাধ্যমে রাষ্ট্রের আয় অর্জিত হয়, সে ব্যবস্থা রাষ্ট্র চাইলে করতেই পারে। বিষয়টি বসুন্ধরা কে বাদ দিয়ে বা বসুন্ধরাকে উপেক্ষিত করে করা কতটুকু সমচীন হবে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। এক জাতীয় দৈনিকের ভিত্তিতে বাংলাদেশের ভিতর দুটি রাষ্ট্রকে আলাদাভাবে কল্পনা করা করছেন, একটি হলো মোহাম্মদপুর এলাকা যা সন্ত্রাসী এলাকা হিসেবে চিহ্নিত, আপরটি হলো বসুন্ধরা যেখানে রয়েছে অনাবিল সুন্দর সুশৃংখল এবং সম্পূর্ণ নিরাপদ একটি আবাসিক এলাকা। দুটি দু দিক থেকে বিপরীত হলেও আভিজাত এলাকা হিসেবে সবাই বসুন্ধরাকেই বেছে নেবেন। সুতরাং থাক না বসুন্ধরা তার নিজস্ব স্বকীয়তা নিয়েই। যেখানে সবাই নিরাপদ বোধ করবেন একই সাথে গর্বিত হবেন, প্রতিটি ফ্ল্যাট মালিকেরা।
বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো প্রায়ই নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করে। বিনিময়ে সরকারও তাদের কাছ থেকে সমর্থন পায়। এখানে উভয় পক্ষেরই স্বার্থ জড়িত থাকে। ফলে অনেক সময় ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট গঠনে সাহসী হয়ে ওঠেন, যা কোনো সুস্থ রাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচক নয়। তবে এটি শুধু বসুন্ধরার ক্ষেত্রেই ঘটেছে ব্যাপারটা এমন নয়। বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীই রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে ব্যবসায়িক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করে থাকে। তবুও প্রশ্ন থেকে যায়, কেন বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোকে রাজনৈতিক আনুগত্যের মাধ্যমে টিকে থাকতে হবে? আর যদি সেই আনুগত্য না থাকার কারণে কোনো প্রতিষ্ঠানের স্বকীয়তা নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়, সেটিও কতটা যুক্তিসংগত?
বসুন্ধরা একটি আভিজাত এলাকা, এখানে বিত্তবানদের বসবাস, এ কারণেই এই আবাসিক এলাকায় গড়ে উঠেছে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, হার্ডকো ইন্টারন্যাশনাল এবং ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের এবং এসটিএস মতো স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রয়েছে এবার কেয়ার এর মত আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল। তাই এখানে নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্তের ঠাই নেই। এটি এক অর্থে ভালো। এক অর্থে এটি এমন এক “সুখকেন্দ্র”, যেখানে অর্থ থাকলে মানুষ স্বস্তি ও নিরাপত্তা কিনতে পারে। সুতরাং এই সুখকেন্দ্রটি বৃত্তবানদের জন্য অক্ষতই থাক! তাই অনেকেই মনে করেন, এই আবাসিক এলাকাটি তার নিজস্ব সৌন্দর্য, নিরাপত্তা ও স্বকীয়তা নিয়েই টিকে থাকুক, ইট-পাথরের ব্যস্ত শহরের মাঝে এক টুকরো সবুজ, পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল আবাসিক পরিবেশ হিসেবে।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *