বাকৃবি শিক্ষার্থীদের ভাবনায় ঈদের একাল সেকাল 

বাকৃবি সংবাদদাতা:

সময়ের সাথে সাথে বড় হওয়ার ব্যস্ততায় ঈদের অনাবিল আনন্দের রূপ কিছুটা বদলে গেছে। ফেলে আসা শৈশবের ঈদ আর বর্তমানের যান্ত্রিক জীবনের মাঝে দাঁড়িয়ে নিজেদের অনুভূতি ও স্মৃতি ভাগাভাগি করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল শিক্ষার্থী।

শৈশবে ঈদে নতুন জামা কেনার চেয়েও বড় বিষয় ছিল জামা কেনায় বন্ধুদের সাথে পাল্লা দেওয়া। দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে কৃষি অনুষদের শিক্ষার্থী রোকাইয়া ফারজানা ইভা বলেন, “নতুন জামা নিয়ে কারটা বেশি সুন্দর, কে কয়টা জামা কিনেছে এসব নিয়ে চলত ছোট ছোট প্রতিযোগিতা। অনেক সময় জামা আগে থেকে কাউকে দেখানো যেত না, যেন ঈদের দিন সবাই চমকে যায়। ঈদের আগে বন্ধুদের সাথে ঈদ কার্ড বিনিময় করার মজাই ছিল আলাদা। ঈদের দিন সকাল থেকে শুরু হতো এক বাসা থেকে আরেক বাসায় যাওয়া, নানা রকম মজার খাবার খাওয়া। বড়দের কাছ থেকে সালামি পাওয়ার আনন্দ ছিল সবচেয়ে বেশি।”

ঈদের আনন্দটা কেবল নিজের মাঝে সীমাবদ্ধ না থেকে ছড়িয়ে পড়ে পুরো পরিবারে। স্মৃতিচারণ করে কৃষি অনুষদের শিক্ষার্থী মো. ইশতিয়াক খান বলেন, “ভোর হতেই আব্বার চিল্লাপাল্লা শুরু হয়ে যায়, এই হয়তো জামায়াত মিস হয়ে গেলো! গোসল সেরে ঈদগাহে নামাজ, আর এলাকাবাসীর সাথে কোলাকুলির মুহূর্তগুলো সত্যিই আনন্দের। দাদা-দাদির কবর জিয়ারত শেষে বাসায় ফিরে আম্মার রান্নার সুঘ্রাণ পাওয়া, খাওয়া-দাওয়া আর সারা বছর দেখা না হওয়া বন্ধুবান্ধব ও পরিচিত ভাইদের সাথে আড্ডা ও খোঁজখবর নেওয়া ঈদের অন্যতম আকর্ষণ।”

শৈশবের ঈদের সবচেয়ে বড় ‘প্রজেক্ট’ ছিল সালামি সংগ্রহ করা। গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান ও অর্থনীতি অনুষদের শিক্ষার্থী আফসানা খান জানান, “ছোটবেলার ঈদের সবচেয়ে বড় কাজ ছিল সালামি সংগ্রহের মিশন! কে সবচেয়ে আগে তৈরি হয়ে বের হতে পারবে, আর কে সবচেয়ে বেশি সালামি জোগাড় করতে পারবে এটাই ছিল আমাদের প্রধান প্রতিযোগিতা। অবশ্য কিছু নির্দিষ্ট সালামি দাতাও ছিল, যাদের কাছে যাওয়া একদম বাধ্যতামূলক ছিল। তবে মজার ব্যাপার হলো, সেই কষ্ট করে জোগাড় করা সালামি কখনোই আমার কাছে থাকত না। সবই জমা দিতে হতো আম্মুর কাছে। আম্মু বলতেন, ‘ব্যাংকে রাখব, পরে অনেক বেশি টাকা পাবে।’ সেই আশায় বিশ্বাস করে কত সালামিই যে তার কাছে জমা দিয়েছি! কিন্তু পরে সেই টাকার হিসাব আর কখনো ঠিকমতো পাইনি।”

চাঁদ রাতে হাতে মেহেদি পরার সেই চিরায়ত মুহূর্তগুলো আজও আবেগপ্রবণ করে তোলে কৃষি অনুষদের শিক্ষার্থী সাদিয়া আফরিনকে। তিনি বলেন, “আপুদের সাথে কাটানো চাঁদ রাত, সন্ধ্যা হলেই আপুর পেছনে পেছনে ঘুরতাম কখন আমার দুই হাত ভরা মেহেদি দিয়ে দিবে, কখন সকাল হবে, নতুন জামা পড়ব। আর সকালে নতুন জামা পরে আব্বুর হাত ধরে ঈদগাহে যাওয়ার সেই আনন্দ এখন যেন কেবলই বিলাসিতা।”

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এবং সময়ের সাথে সাথে পাল্টে গেছে সেই ঈদের আমেজ।

কৃষি অনুষদের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী এহসান অন্তর জানান, “ঈদের দিন সকালে নামাজের পর শুরু হয় আসল আনন্দ। নতুন পোশাকে সেজে বেরিয়ে পড়ি বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে। তারপরই ছবি তোলা আর মজার মুহূর্তগুলো ধরে রাখা। তবে এখন আর সব আগের মতো নেই। ঈদে প্রযুক্তির ছোঁয়া স্পষ্ট। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়াটা এখন এক ধরনের ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে।”

বাকৃবির ইন্টারডিসিসিপ্লিনারি ইনস্টিটিউট ফর ফুড সিকিউরিটি (আইআইএফএস) এর শিক্ষার্থী খালিদ হাসান বলেন, “ঈদের আগের রাতটা হল উৎসবের মহড়া- নতুন কাপড় গুছানো, বন্ধুদের সাথে শেষ মুহূর্তের আড্ডা, আর সোশ্যাল মিডিয়ায় শুভেচ্ছা বিনিময়। কেউ ব্যস্ত সেলফিতে, কেউবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে। সালামির নতুন নোটের জায়গায় এখন স্থান নিয়েছে অনলাইনে লেনদেন।”

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *