হাবিপ্রবি প্রতিনিধি:
ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬-এর পর্দা উঠতেই উৎসবের আমেজে রঙিন হয়ে উঠেছে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (হাবিপ্রবি) ক্যাম্পাস। আবাসিক হলের ছাদ ও বারান্দায় উড়ছে প্রিয় দলের পতাকা, শিক্ষার্থীদের গায়ে শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন দেশের জার্সি। চায়ের দোকান, টিএসসি, হলের আড্ডা থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গ্রুপ ও পেজগুলোতেও এখন বিশ্বকাপই আলোচনার প্রধান বিষয়।
ক্লাস-পরীক্ষার ব্যস্ততার মাঝেও প্রিয় দলকে ঘিরে চলছে তর্ক-বিতর্ক, ট্রল, মিম ও বন্ধুত্বপূর্ণ খুনসুটি। কেউ আর্জেন্টিনা, কেউ ব্রাজিল, আবার কেউ ফ্রান্স, পর্তুগাল, স্পেন কিংবা ঘানার সমর্থনে তুলে ধরছেন নানা যুক্তি। বিশ্বকাপকে ঘিরে এমন প্রাণচাঞ্চল্যে ক্যাম্পাসজুড়ে তৈরি হয়েছে এক উৎসবমুখর পরিবেশ।
বিশ্বকাপকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, প্রিয় দল এবং সেই দলকে সমর্থনের পেছনের গল্প জানতে কথা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের কয়েকজন ফুটবলপ্রেমী শিক্ষার্থীর সঙ্গে।
ইংরেজি ১৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী হাফিজুর রহমান হাফিজ বলেন,“ আর্জেন্টিনা আমার প্রিয় দল কারণ এই দলের খেলায় আমি আবেগ, ঐতিহ্য এবং অদম্য লড়াইয়ের মানসিকতা দেখতে পাই। জয়-পরাজয় যাই হোক না কেন, আর্জেন্টিনা সবসময় সাহসী ও আকর্ষণীয় ফুটবল উপহার দেয়। তাদের দলীয় ঐক্য, এবং পরিশ্রমের জন্য সর্বোচ্চটা দেওয়ার মনোভাব আমাকে মুগ্ধ করে।আমার প্রত্যাশা আর্জেন্টিনা এবারের বিশ্বকাপেও দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করবে এবং ফুটবলপ্রেমীদের সুন্দর ও স্মরণীয় কিছু মুহূর্ত উপহার দেবে। নীল-সাদা জার্সির এই দলটি আবারও বিশ্বকাপের ট্রফি উঁচিয়ে ধরুক এবং বিশ্বজুড়ে তাদের সমর্থকদের আনন্দে ভাসিয়ে দিক ”
ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং ১৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী অমিত চন্দ্র দাস বলেন, “আমার প্রিয় দল ঘানা। ছোটবেলা থেকেই দলটির খেলা দেখে আসছি। ঘানার গতি, লড়াকু মানসিকতা এবং সাহসী ফুটবল আমাকে সবসময় মুগ্ধ করে। বিশ্বকাপে ঘানা একাধিকবার নকআউট পর্বে উঠেছে এবং ২০১০ সালে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে ইতিহাস গড়েছিল।
এবারের বিশ্বকাপেও ঘানার কাছ থেকে ভালো কিছুর প্রত্যাশা করছি। দলটি নিজেদের সেরাটা খেলতে পারলে যেকোনো প্রতিপক্ষকে কঠিন চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্ষম। আমি আশা করি, ঘানা এবারও দর্শকদের উপভোগ্য ফুটবল উপহার দেবে।”
ফাইন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং ১৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী রিয়া মোদক বলেন, “আমি ছোটবেলা থেকেই আর্জেন্টিনার সমর্থক। দলটির খেলার ধরণ, লড়াই করার মানসিকতা এবং মাঠে কখনো হাল না ছাড়ার মনোভাব আমার ভালো লাগে। আর্জেন্টিনার ম্যাচগুলো আমি সবসময় আগ্রহ নিয়ে দেখি।এবারের বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনাকে ভালো অবস্থানে দেখছি। দলে অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান তরুণও আছে। তবে বিশ্বকাপে কোনো ম্যাচই সহজ নয়, তাই ধারাবাহিক ভালো খেলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমার প্রত্যাশা, আর্জেন্টিনা ভালো ফুটবল খেলবে এবং শিরোপার জন্য শেষ পর্যন্ত লড়াই করবে। বিশ্বকাপ জমজমাট হোক, আর দর্শকরা উপভোগ করুক দারুণ কিছু ম্যাচ।”
ইইই ২২ ব্যাচের শিক্ষার্থী মাহামুদুল হাসান বলেন, “ফুটবল সবসময়ই আমার আবেগের জায়গা, আর ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে আমার সমর্থন থাকবে ব্রাজিলের প্রতি। ব্রাজিলকে সমর্থন করার অন্যতম কারণ হলো তাদের সমৃদ্ধ ফুটবল ঐতিহ্য, সৃজনশীল খেলার ধরণ, আক্রমণাত্মক মানসিকতা এবং নতুন প্রজন্মের প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের উপস্থিতি। ব্রাজিল শুধু একটি দল নয়,এটি ফুটবল সৌন্দর্য ও আবেগের একটি প্রতীক।এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সম্ভাবনা নিয়েও আমি আশাবাদী। সঠিক পরিকল্পনা, দলীয় সমন্বয় ও ধারাবাহিক পারফরম্যান্স ধরে রাখতে পারলে দলটি শিরোপার জন্য শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে। প্রত্যাশা একটাই সুন্দর ফুটবল উপহার দিয়ে ব্রাজিল আবারও বিশ্বমঞ্চে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করুক।”
ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং ২২ ব্যাচের শিক্ষার্থী আসাদুজ্জামান আরিফ বলেন, “ফুটবল বিশ্বকাপে আমি আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলকে নয়, ফ্রান্সকে সমর্থন করি। কারণ ফ্রান্স শুধু একটি দল নয়, আমার কাছে সাহস, প্রতিভা ও লড়াইয়ের প্রতীক। ২০১৮ সালে তাদের বিশ্বকাপ জয় এবং তরুণ Kylian Mbappé-এর দুর্দান্ত পারফরম্যান্স আমাকে ফ্রান্সের প্রেমে ফেলেছিল। আর ২০২২ সালের ফাইনালে দুই গোল পিছিয়ে থেকেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাদের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন দেখিয়ে দিয়েছিল, কেন ফ্রান্স বিশ্বের অন্যতম সেরা দল। জয়-পরাজয় নয়, তাদের লড়াকু মানসিকতা ও সুন্দর ফুটবলই আমাকে বারবার ফ্রান্সের পাশে দাঁড়াতে শেখায়। তাই গর্বের সাথে বলি—আমার হৃদয়ের দল ফ্রান্স। “চ্যাম্পিয়ন হওয়া বড় কথা, কিন্তু হার না মানা চ্যাম্পিয়নের পরিচয়। আর সেই কারণেই আমি ফ্রান্সকে সমর্থন করি।”
ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ ২৫ ব্যাচের শিক্ষার্থী আল হেরা বলেন,”আমার প্রিয় দল ব্রাজিল। ছোটবেলা থেকেই তাদের আক্রমণাত্মক ও নান্দনিক ফুটবল খেলার ধরন আমাকে মুগ্ধ করে, তাই ব্রাজিলকে সমর্থন করি। দলটিতে তরুণ ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের ভালো সমন্বয় রয়েছে, যা তাদের শক্তি বাড়িয়েছে। এবারের বিশ্বকাপেও ব্রাজিল শিরোপার অন্যতম দাবিদার বলে আমি মনে করি। আমার প্রত্যাশা, তারা দারুণ পারফরম্যান্স করে সমর্থকদের আনন্দ দেবে এবং বিশ্বকাপ জয়ের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে।”
এগ্রিকালচার ২৩ ব্যাচের শিক্ষার্থী রাকিবুল হাসান বলেন, “আমার প্রিয় দল আর্জেন্টিনা। ছোটবেলা থেকেই আর্জেন্টিনার খেলা দেখে আসছি, তাই দলটির প্রতি একটা আলাদা আবেগ কাজ করে। জিতুক বা হারুক, বিশ্বকাপ এলেই আর্জেন্টিনাকে ঘিরে উত্তেজনা অন্যরকম থাকে। দলের লড়াকু মানসিকতা, সুন্দর পাসিং ফুটবল এবং মেসির খেলা আমাকে সবসময় মুগ্ধ করে।এবারের বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনার কাছ থেকে ভালো কিছু প্রত্যাশা করছি। বর্তমান ফুটবলে কোনো দলকেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই, তাই পথটা সহজ হবে না। তবে দলটি যদি নিজেদের সেরা খেলাটা খেলতে পারে, তাহলে এবারও চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সামর্থ্য তাদের আছে।োআশা করি আমার প্রিয় দল আর্জেন্টিনা দারুণ একটি বিশ্বকাপ উপহার দেবে।”
কেমিস্ট্রি ২৩ ব্যাচের শিক্ষার্থী কাওসার হাবিব বলেন, “২০১৩ সালে প্রথমবার টেলিভিশনে ব্রাজিলের ফুটবল খেলা দেখি এক বন্ধুর বাড়িতে। তখন খেলোয়াড়দের কাউকেই চিনতাম না, কিন্তু একজনকে বারবার চোখে পড়ছিল; মাথাভর্তি কোঁকড়ানো চুল, অসাধারণ গতি ও স্কিল নিয়ে তিনি পুরো মাঠজুড়ে ছুটে বেড়াচ্ছিলেন। পরে জানতে পারি, তিনি মার্সেলো ভিয়েইরা। এরপর ২০১৪ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের প্রতি ভালোবাসা আরও গভীর হয়, যেখানে নেইমার, থিয়াগো সিলভা, ডেভিড লুইজ ও অস্কারের মতো খেলোয়াড়রা আমাকে মুগ্ধ করে। সেই সেমিফাইনালের পরাজয় কষ্ট দিলেও, সেটাই অদ্ভুতভাবে দলটির প্রতি ভালোবাসা আরও বাড়িয়ে দেয়।আজ ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ব্রাজিলকে ঘিরে আবারও আশা ও শঙ্কা দুটোই কাজ করছে। তবে নেইমারের চোট কাটিয়ে ফিরে আসা এবং ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, এন্দ্রিক, রদ্রিগো ও রাফিনিয়ার মতো তরুণ প্রতিভাদের উপস্থিতি নতুন স্বপ্ন দেখায়।ট্রফি জিতুক বা না জিতুক, সুন্দর ফুটবলের ঐতিহ্য, সাহসী মানসিকতা এবং সমর্থকদের হৃদয়ে স্বপ্ন জাগিয়ে তোলার ক্ষমতা যেন কখনো হারিয়ে না যায়। তবে কোটি কোটি সমর্থকের মতো আমিও অপেক্ষায় আছি সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তের, যখন আবারও বিশ্বফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে ব্রাজিল মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
ভামোস ব্রাজিল।
মিশন হেক্সা!!”
ম্যানেজমেন্ট ২৪ ব্যাচের শিক্ষার্থী সবুজ সাহেব বলেন, “নেইমার শিখিয়েছে স্বপ্ন দেখতে, ভিনিসিয়ুস শিখিয়েছে লড়তে, আর ব্রাজিল শিখিয়েছে ফুটবলকে ভালোবাসতে। তাই বিশ্বকাপ এলেই হৃদয়ের প্রথম নাম ব্রাজিল। সব মিলিয়ে ব্রাজিল আমার কাছে আবেগের নাম। পাঁচ তারকা ইতিহাস, ষষ্ঠ তারকা স্বপ্ন নয়— প্রত্যাশা। ”
এগ্রিকালচার ইঞ্জিনিয়ারিং ২৫ ব্যাচের শিক্ষার্থী সিজান ইসলাম বলেন, “প্রিয় দল পর্তুগাল,পর্তুগালকে সমর্থন করার মূল কারণ দলটির লড়াকু মানসিকতা এবং অবশ্যই ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। তাঁর অবিশ্বাস্য ক্যারিয়ার, কঠোর পরিশ্রম আর ফুটবল মাঠের নেতৃত্ব তরুণ প্রজন্মকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে। তবে বর্তমানের পর্তুগাল কেবল একক কোনো খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং ব্রুনো ফার্নান্দেস, বার্নার্ডো সিলভা, রাফায়েল লিয়াও এবং রুবেন দিয়াজের মতো বিশ্বমানের তারকাদের নিয়ে গড়া এই দলটির পাসিং ফুটবল এবং আক্রমণাত্মক শৈলী যেকোনো ফুটবলপ্রেমীর মন জয় করতে বাধ্য।ইউরোপের অন্যতম ভারসাম্যপূর্ণ দল হিসেবে এবারের মেগা টুর্নামেন্টে পর্তুগালের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। দলে অভিজ্ঞ প্রবীণদের পাশাপাশি তরুণ প্রতিভার দারুণ এক সংমিশ্রণ রয়েছে। গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে নকআউট পর্বে নিজেদের ছন্দ ধরে রাখতে পারলে যেকোনো পরাশক্তিকে হারানোর সামর্থ্য রাখে তারা।রোনালদোর এই সম্ভাব্য শেষ বিশ্বমঞ্চে পুরো দলের কাছে আমাদের প্রত্যাশা—তারা যেন প্রতিটি ম্যাচ ফাইনাল মনে করে মাঠে নামে।