কৃষিবিদ আবুল হাসানাত // কৃষিবিদ মো: মঞ্জুরুল হক:
বাংলাদেশের উপকূলীয় ও গ্রামীণ অঞ্চলে নারিকেল একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত। এই নারিকেল গাছের কচি ফুলের মোচা থেকে সংগৃহীত রস বা “নীরা” প্রক্রিয়াজাত করে স্বাস্থ্যসম্মত ও পুষ্টিকর গুড় তৈরি করা সম্ভব। প্রাকৃতিক এই মিষ্টিজাত পণ্যটি দেশের খাদ্যসংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
রস সংগ্রহের পদ্ধতি:
নারিকেল গাছের কচি মোচা থেকে বিশেষ কৌশলে রস সংগ্রহ করা হয়। প্রথমে মোচার অগ্রভাগ পরিষ্কারভাবে কেটে সেখানে একটি পরিষ্কার পাত্র ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। সাধারণত দিনে দুইবার—ভোরবেলা ও বিকেলে—রস সংগ্রহ করা হয়। রস যাতে দ্রুত নষ্ট বা ফারমেন্ট না হয়, সেজন্য পাত্রে সামান্য চুন বা প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করা হয়। সংগৃহীত এই তরল রস স্থানীয়ভাবে “নীরা” নামে পরিচিত।
গুড় তৈরির প্রক্রিয়া:
সংগ্রহ করা নীরা প্রথমে ছাঁকনি বা পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ছেঁকে নেওয়া হয়। এরপর বড় কড়াইয়ে ঢেলে ধীরে ধীরে জ্বাল দেওয়া হয়। ফুটতে থাকলে উপরে জমা হওয়া ফেনা ও অমেধ্য তুলে ফেলা হয়। দীর্ঘ সময় জ্বাল দেওয়ার ফলে রস ঘন হয়ে আঠালো আকার ধারণ করে। নির্দিষ্ট ঘনত্বে পৌঁছালে তা চুলা থেকে নামিয়ে ছাঁচে ঢেলে ঠান্ডা করা হয়। ঠান্ডা হলে তা শক্ত ও সুস্বাদু গুড়ে পরিণত হয়।
গুড়ের গুণাগুণ ও ব্যবহার:
নারিকেল গুড় প্রাকৃতিক শর্করা, খনিজ উপাদান ও শক্তির একটি উৎকৃষ্ট উৎস। এটি পিঠা, পায়েস, চা এবং বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খাবারে ব্যবহৃত হয়। পরিশোধিত চিনির তুলনায় এটি স্বাস্থ্যসম্মত হওয়ায় বর্তমানে এর চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে।
গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা:
এই প্রযুক্তি নিয়ে ২০১৫ সালে কাজ শুরু করেন বিসিআরআই (BSRI), ঈশ্বরদী-পাবনা এর সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোঃ আবুল হাসনাত। তিনি দীর্ঘদিন ধরে নারিকেল রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির এই পদ্ধতি উন্নয়নে কাজ করলেও পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে তা বিস্তৃতভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তবে তার গবেষণা প্রমাণ করে যে, সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে এই খাতটি দেশের জন্য একটি লাভজনক শিল্পে পরিণত হতে পারে।
সম্ভাবনা ও গুরুত্ব:
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারিকেল রস থেকে গুড় উৎপাদন একটি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উদ্যোগ। এটি গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষকের অতিরিক্ত আয় বৃদ্ধি এবং দেশীয় খাদ্যসংস্কৃতি সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশে নারিকেল গাছের প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও এর পূর্ণ সম্ভাবনা এখনো কাজে লাগানো হয়নি। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে এই প্রযুক্তির উন্নয়ন ও বিস্তার ঘটানো গেলে তা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।