বাকৃবি বিশেষ সংবাদদাতা:
বাংলাদেশের ছাগলের মধ্যে প্রথমবারের মতো ‘বারখোল্ডেরিয়া সেপাসিয়া কমপ্লেক্স’ (Burkholderia cepacia complex) নামের রোগসৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতির বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়ার দাবি করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক। শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা ও গর্ভপাতের পূর্ব ইতিহাস থাকা ছাগলের নমুনা পরীক্ষা করে ব্যাকটেরিয়াটির উপস্থিতি শনাক্ত করেন তারা।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘোড়া, কুকুর, বিড়াল, পাখি, ভেড়া ও অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে এ ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি শনাক্ত হলেও বাংলাদেশের ছাগলের মধ্যে এর উপস্থিতি আগে বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘পিএলওএস ওয়ান’-এ প্রকাশিত বাকৃবির এ গবেষণায় দেশের ছাগলের মধ্যে ব্যাকটেরিয়াটির উপস্থিতির প্রথম বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।
গবেষক দলের বরাতে জানা যায়, ব্যাকটেরিয়াটির কিছু প্রজাতি মানুষের শরীরে গুরুতর সংক্রমণ ঘটাতে পারে। বিশেষ করে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা ও দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য এটি ঝুঁকিপূর্ণ।
গবেষণাটির নেতৃত্ব দিয়েছেন বাকৃবির মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সিদ্দিকুর রহমান এবং প্রধান গবেষক ছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুন। গবেষণায় আরও ছিলেন এস. এম. সুজন আশরাফ, আমির হামজা শুভ, ফারহান ইবনে সিদ্দিক, হাসান খান, নাঈম আহমেদ ইব্রাহিম ফাহিম, চন্দ্র শেখর চৌহান, ফারজানা ইয়াসমিন, ড. মো. মাহবুব আলম ও ড. মো. তানভীর রহমান। বাকৃবির ভেটেরিনারি সায়েন্স অনুষদের মেডিসিন বিভাগের গবেষকদের পাশাপাশি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজের গবেষকেরাও এতে যুক্ত ছিলেন।
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গবেষণা অনুদানে গবেষণাটি পরিচালিত হয়।
গবেষণায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি খামার থেকে ৪০টি ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা ও গর্ভপাতের পূর্ব ইতিহাস থাকা ৩০টি ছাগল এবং সুস্থ ১০টি ছাগলকে নিয়ন্ত্রণ দল হিসেবে রাখা হয়। নমুনাগুলো ব্যাকটেরিয়া কালচার, সেরোলজিক্যাল পরীক্ষা, পিসিআর, ডিএনএ সিকোয়েন্সিং ও বংশগত সম্পর্ক বিশ্লেষণের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়।
পরীক্ষায় অসুস্থতার ইতিহাস থাকা কয়েকটি ছাগলের নমুনায় বারখোল্ডেরিয়া ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া যায়। পরবর্তী আণবিক পরীক্ষা ও ডিএনএ সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে সেগুলোকে বারখোল্ডেরিয়া সেপাসিয়া কমপ্লেক্স হিসেবে নিশ্চিত করেন গবেষকেরা। অন্যদিকে সুস্থ ছাগলের নমুনায় কোনো ব্যাকটেরিয়াল বৃদ্ধি পাওয়া যায়নি। শনাক্ত ব্যাকটেরিয়ার বংশগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে ভারত, জাপান ও চীনে আগে শনাক্ত হওয়া বারখোল্ডেরিয়া প্রজাতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষণায় পাওয়া ডিএনএ সিকোয়েন্স আন্তর্জাতিক জেনব্যাংক তথ্যভান্ডারেও সংরক্ষণ করা হয়েছে।
অধ্যাপক ড. মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের ছাগলের মধ্যে বারখোল্ডেরিয়া সেপাসিয়া কমপ্লেক্সের উপস্থিতির এটি প্রথম বৈজ্ঞানিক প্রমাণ। এ আবিষ্কার ব্যাকটেরিয়াটির বিস্তার, সংক্রমণের উৎস, প্রাণিস্বাস্থ্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব এবং জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে নতুন গবেষণার সুযোগ তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, বারখোল্ডেরিয়া সেপাসিয়া কমপ্লেক্স পরস্পর ঘনিষ্ঠ কয়েকটি ব্যাকটেরিয়ার একটি গোষ্ঠী। এগুলো পরিবেশে টিকে থাকতে পারে এবং আন্তর্জাতিকভাবে সুযোগসন্ধানী রোগজীবাণু হিসেবে পরিচিত। মানুষের ক্ষেত্রে এর কিছু প্রজাতি গুরুতর সংক্রমণ ঘটাতে পারে।
গবেষণায় যুক্ত আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী ফারহান বলেন, এ গবেষণার মাধ্যমে প্রাণী ও মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ‘ওয়ান হেলথ’ ধারণাকে আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের গবেষণা দেশের জনস্বাস্থ্য ও প্রাণিস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গবেষকেরা জানান, এই গবেষণায় ব্যাকটেরিয়াটিকে ছাগলের গর্ভপাতের কারণ হিসেবে সরাসরি প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া বারখোল্ডেরিয়া সেপাসিয়া কমপ্লেক্সের কিছু প্রজাতি মানুষের ক্ষেত্রে গুরুতর সংক্রমণ ঘটাতে সক্ষম হলেও, বর্তমান গবেষণায় ছাগল থেকে মানুষের মধ্যে এ ব্যাকটেরিয়া সংক্রমিত হওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কারণ, গবেষণায় মানুষের বা খামারের পরিবেশের নমুনা পরীক্ষা করা হয়নি। তাই প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমণের সম্ভাব্য ঝুঁকি নির্ধারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ছাগল, খামারের পরিবেশ ও মানুষের নমুনা নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।