নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর:
রংপুরের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শ্যামাসুন্দরী খালকে পরিকল্পিতভাবে পুনরুদ্ধার করে স্বচ্ছ পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা গেলে নগরীর পরিবেশের উন্নয়নের পাশাপাশি কৃষি, মৎস্যসম্পদ, কর্মসংস্থান ও পর্যটন খাতেও নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে। খালের দুই পাড়ে পরিকল্পিত সবুজায়ন, মাছ ও হাঁস চাষ এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এটি নগরবাসীর জন্য আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হতে পারে বলে মনে করেন কৃষি উদ্যোক্তা ইঞ্জিনিয়ার মো. লতিফুর রহমান মিলন।
বাংলাদেশ ডেয়ারি অ্যান্ড ফার্ম ট্রেনিং ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি এবং রংপুর জেলা ও বিভাগীয় ডেয়ারি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মিলন বলেন, আন্তরিকতা, কার্যকর পরিকল্পনা ও যথাযথ উদ্যোগের অভাবে শ্যামাসুন্দরী খাল আজ বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে। খালটির স্বাভাবিক পরিবেশ ও পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা গেলে তা রংপুরের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গত ২৬ অক্টোবর নগরীর নিউ ক্রস রোড এলাকায় নিজের সমন্বিত খামারে এক মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।
শ্যামাসুন্দরী খাল ঘিরে উন্নয়নের নতুন ভাবনা
রংপুর নগরীর ঐতিহ্যবাহী শ্যামাসুন্দরী খালকে ঘিরে সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে ইঞ্জিনিয়ার মিলন বলেন, খালটিতে স্বচ্ছ পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা গেলে হাঁস ও মাছ চাষের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে খালের দুই পাড়ে নারিকেলজাতীয় গাছসহ উপযোগী গাছ লাগিয়ে সবুজায়ন করা গেলে পরিবেশের সৌন্দর্য বাড়বে।
তাঁর মতে, খালকে শুধু পানি নিষ্কাশনের অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা না করে এর পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক গুরুত্বও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। পরিকল্পিতভাবে খাল পুনরুদ্ধার করা গেলে এর সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবিকা, ক্ষুদ্র উদ্যোগ এবং পর্যটন কার্যক্রমের সম্ভাবনাও যুক্ত হতে পারে।
তবে এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য খালের পানির প্রবাহ ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা ছাড়া খালকে টেকসইভাবে ব্যবহারযোগ্য রাখা কঠিন হবে।
ইঞ্জিনিয়ার মিলনের বক্তব্যে শ্যামাসুন্দরী খাল পুনরুদ্ধারের বিষয়টি শুধু নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পরিবেশ, জীবিকা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সমন্বিতভাবে দেখার একটি ধারণা উঠে এসেছে।
কৃষিনির্ভর রংপুরে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ার তাগিদ
রংপুর অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রসঙ্গে ইঞ্জিনিয়ার মিলন বলেন, এ অঞ্চল মূলত কৃষিনির্ভর। তাই কৃষিকে কেন্দ্র করেই উন্নয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। কৃষির মাধ্যমে অর্থনৈতিক পরিবর্তন আনতে কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানা স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি মনে করেন, কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সেগুলোর প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের সুযোগ সম্প্রসারণ করা জরুরি। কৃষির সঙ্গে শিল্পের কার্যকর সংযোগ গড়ে উঠলে উৎপাদিত পণ্যের মূল্য সংযোজন এবং নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশ কৃষক, উদ্যোক্তা, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিসর বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ তৈরি হলে কৃষিকে ঘিরে নতুন কর্মসংস্থানের পথও উন্মুক্ত হতে পারে।
তাঁর মতে, রংপুরের কৃষি সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে উৎপাদনকেন্দ্রিক চিন্তার পাশাপাশি বাজার, প্রযুক্তি, সংরক্ষণ ও শিল্পায়নের বিষয়গুলোকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
আধুনিক কৃষি ও সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনায় সম্ভাবনা
কৃষির প্রতি গভীর ভালোবাসা ও আগ্রহ থেকে ইঞ্জিনিয়ার মো. লতিফুর রহমান মিলন রংপুর নগরীর প্রাণকেন্দ্রে নিজের বাড়িতেই গড়ে তুলেছেন একটি সমন্বিত খামার। সেখানে উন্নত জাতের গাভি, ছাগল, হাঁস, দেশি মুরগি ও কবুতরসহ বিভিন্ন ধরনের প্রাণিসম্পদ রয়েছে।
তাঁর খামারটি প্রাণিসম্পদ পালন ও সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনা নিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের একটি উদাহরণ। বিভিন্ন ধরনের প্রাণিসম্পদ একসঙ্গে পালন করতে হলে খাদ্য সরবরাহ, পরিচর্যা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, রোগ প্রতিরোধ ও খামারের পরিচ্ছন্নতার মতো বিষয়গুলোতে নিয়মিত নজর দেওয়া প্রয়োজন।
আধুনিক কৃষি ও খামার ব্যবস্থাপনা নিয়ে তাঁর আগ্রহের পেছনে রয়েছে কৃষিকে আরও কার্যকর ও সম্ভাবনাময় পেশা হিসেবে গড়ে তোলার চিন্তা। কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ বাড়ানো গেলে উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনায় একাধিক কৃষি ও প্রাণিসম্পদভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ থাকায় উদ্যোক্তারা তাঁদের সম্পদ ও সক্ষমতা অনুযায়ী বিভিন্ন আয়ের উৎস গড়ে তোলার পরিকল্পনা করতে পারেন। তবে এ ধরনের উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করে সঠিক পরিকল্পনা, বাজার পরিস্থিতি, উৎপাদন ব্যয় ও নিয়মিত ব্যবস্থাপনার ওপর।
তিস্তা অববাহিকার পানিসংকট কৃষির গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ
রংপুর অঞ্চলের কৃষি উন্নয়নের আলোচনায় তিস্তা অববাহিকার পানিসংকটও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইঞ্জিনিয়ার মিলনের মতে, কৃষির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পানিসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও কৃষির বাস্তব চাহিদাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে পানির প্রাপ্যতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণে কৃষি উন্নয়ন পরিকল্পনায় পানির ব্যবহার, সেচব্যবস্থা এবং স্থানীয় কৃষকদের প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। পানিসম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে কৃষির উৎপাদনশীলতা ও স্থিতিশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগ আরও কার্যকর হতে পারে।
তিস্তা অববাহিকাকে ঘিরে কৃষির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে স্থানীয় পর্যায়ের সমস্যা চিহ্নিত করা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে কৃষকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও চাহিদাকে উন্নয়ন পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।
কর্মসংস্থান ও পর্যটনের সম্ভাবনা
ইঞ্জিনিয়ার মিলনের প্রস্তাবনায় শ্যামাসুন্দরী খাল পুনরুদ্ধারের সঙ্গে স্থানীয় কর্মসংস্থান ও পর্যটনের সম্ভাবনাও যুক্ত রয়েছে। খালের দুই পাড়ে পরিকল্পিত সবুজায়ন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং মাছ ও হাঁস চাষের মতো কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা গেলে বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
এ ধরনের উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণে বাস্তবায়ন করা গেলে পরিচর্যা, রক্ষণাবেক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট সেবামূলক কাজে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি খালকে কেন্দ্র করে পরিবেশবান্ধব বিনোদন ও পর্যটন কার্যক্রমের পরিকল্পনাও বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রথমে খালের বর্তমান অবস্থা মূল্যায়ন, পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয়তা নিরূপণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। পরিকল্পনার সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় মানুষের স্বার্থের সমন্বয়ও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কৃষিকে ঘিরেই রংপুরের উন্নয়নের সম্ভাবনা
ইঞ্জিনিয়ার মো. লতিফুর রহমান মিলনের চিন্তায় রংপুরের উন্নয়নের সঙ্গে কৃষি, প্রাণিসম্পদ, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়গুলো পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। তাঁর মতে, কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলে কৃষিকে আধুনিক করা এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানা স্থাপনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, শ্যামাসুন্দরী খালের মতো ঐতিহ্যবাহী জলাধারকে পুনরুদ্ধার করে পরিবেশ ও জনজীবনের উপযোগী করে তোলা গেলে নগরীর উন্নয়নেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব।
খাল পুনরুদ্ধার, আধুনিক কৃষি, সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনা এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশ—এসব ক্ষেত্রে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে রংপুরের কৃষি ও অর্থনীতির সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃতভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে।