প্রধানমন্ত্রীর সবুজায়ন উদ্যোগে একাত্ম বাকৃবির ভেটেরিনারি অনুষদ

ডা. ফাহমিদা সুলতানা জোনাকী:

জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশদূষণ, বৃক্ষনিধন ও জীববৈচিত্র্যের ক্রমবর্ধমান সংকট সমগ্র বিশ্বের জন্য এক গভীর উদ্বেগের বিষয়।জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর অভিঘাত প্রভাব বিস্তার করছে প্রতিটি দেশের কৃষি, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনীতি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর। বিশেষ করে নদীমাতৃক ও ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে এর বিরূপ প্রভাব গভীরভাবে অনুধাবন করছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে খরা,উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও জলাবদ্ধতা এবং ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।শিল্পায়ন, জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার, বন উজাড় ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বৃদ্ধি পাওয়ায় এই সংকট দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে।

জার্মানভিত্তিক সংস্থা জার্মানওয়াচ প্রকাশিত বিশ্ব জলবায়ু ঝুঁকি সূচক ২০২৬ অনুযায়ী,১৯৯৫-২০২৪ সময়ে দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু ঝুঁকির সূচকে বাংলাদেশ ১৩তম অবস্থানে রয়েছে। অর্থাৎ দীর্ঘ তিন দশকে চরম আবহাওয়াজনিত মৃত্যু, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ও অর্থনৈতিক ক্ষতির বিচারে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি।

এছাড়াও বিশ্বব্যাংকের জলবায়ু প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত আগামী দশকগুলোতে আরও তীব্র হতে পারে। দেশের গড় তাপমাত্রা ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং শতাব্দীর শেষ নাগাদ প্রায় ২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ২০৪০-৫৯ সময়ে দেশের বার্ষিক বৃষ্টিপাত প্রায় ৭৪ মিলিমিটার বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় শুধু বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বৃদ্ধি নয়; বরং স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি, ভারী বর্ষণ এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে ক্রমবর্ধমান অনিয়ম বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের এই অভিঘাত শুধু প্রকৃতি বা পরিবেশেই সীমাবদ্ধ নেই; এর সরাসরি প্রভাব পড়বে মানুষের জীবন-জীবিকা ও দেশের অর্থনীতিতে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ৩০ বছরে কৃষি উৎপাদন ও জীবিকার ওপর চাপ, সুপেয় পানির সংকট এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ দেশের অভ্যন্তরে জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতিতে পড়তে পারে। এমনকি ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে দেশের কৃষি খাতের জিডিপির এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।

এমন বাস্তবতায় জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি (Climate-Smart Agriculture), টেকসই ভূমি ও পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অর্থনীতির ডিকার্বনাইজেশনকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এগুলো মূলত একটি সমন্বিত জাতীয় পরিবেশ ও জলবায়ু নীতির অংশ। কিন্তু রাষ্ট্রীয় নীতির পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকেও ভাবতে হবে—নিজ নিজ পরিসর থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় তারা কী ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষ করে কৃষি শিক্ষা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সমূহের দায়িত্ব আরও বিস্তৃত। শুধু নীতির বাস্তবায়ন বা গবেষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি প্রতিষ্ঠান তার নিজস্ব ক্যাম্পাস, শিক্ষা কার্যক্রম, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে একটি কার্যকর মডেল তৈরি করতে পারে।

কেননা, বাংলাদেশের গ্রিনহাউস গ্যাস (GHG) নির্গমনের আরেকটি প্রধান উৎস হলো কৃষি খাত। দেশের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের প্রায় ৪০ শতাংশই এ খাত থেকে আসে। কৃষি খাতের এই নির্গমনের মধ্যে প্রায় ৩২ শতাংশের জন্য দায়ী ধান উৎপাদন, ৩১ শতাংশ আসে এন্টারিক ফারমেন্টেশন বা গবাদিপশুর হজমপ্রক্রিয়াজনিত নির্গমন থেকে এবং প্রায় ১২ শতাংশের সঙ্গে সম্পৃক্ত গোবর ও হাঁস-মুরগির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।বর্তমান প্রবণতা ও প্রচলিত উৎপাদনব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন না এলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, স্বাভাবিক ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের কৃষি খাত থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ২০১২ সালের ৭৪.৬ মেট্রিক টন কার্বন ডাই অক্সাইড সমতুল্য (MtCO₂e) থেকে বেড়ে ২০৩০ সালে প্রায় ৮৯.২ মেট্রিক টন কার্বন ডাই অক্সাইড সমতুল্য (MtCO₂e)-তে পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ, খাদ্য উৎপাদন ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির চাহিদা মেটাতে গিয়ে যদি পরিবেশবান্ধব ও জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি ব্যবস্থায় দ্রুত রূপান্তর ঘটানো না যায়, তাহলে কৃষিই ভবিষ্যতে জলবায়ু সংকটের অন্যতম বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাকৃবির ভেটেরিনারি অনুষদ  ও ইনিশিয়েটিভস ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (আইএসডিআরএফ) যৌথ উদ্যোগে  সাম্প্রতিক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ক্যাম্পাসে পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ একদিকে যেমন কার্বন শোষণের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব কমাতে সহায়তা করে, অন্যদিকে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, মাটির আর্দ্রতা সংরক্ষণ, বৃষ্টির পানি ধারণ এবং স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহের বাস্তবতায় একটি সবুজ ক্যাম্পাস শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রাণীদের জন্য ফলসহ অপেক্ষাকৃত শীতল ও আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

অপরদিকে, এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরাও পরিবেশ সংরক্ষণের কার্যক্রমে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি তাদের মধ্যে পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়ে সচেতনতা তৈরি হচ্ছে। বলাবাহুল্য,একটি গাছ রোপণ ও তার পরিচর্যা এবং বেড়ে ওঠার সঙ্গে একজন শিক্ষার্থীর সম্পৃক্ততা তাকে প্রকৃতির প্রতি আরও দায়িত্বশীল করে তুলতে পারে।

বিশেষ করে, বর্তমান সরকারের ‘One Child, One Tree’—অর্থাৎ ‘এক শিশু, এক বৃক্ষ’—উদ্ভাবনী চিন্তাধারাকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এ কর্মসূচি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিটি শিক্ষার্থী যদি নিজের হাতে অন্তত একটি বৃক্ষ রোপণ ও পরিচর্যার দায়িত্ব নেয়, তাহলে এটি কেবল একটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পরিবেশ সংরক্ষণকে ব্যক্তিগত দায়িত্ব ও সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার পথ তৈরি করবে।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *