ডা. ফাহমিদা সুলতানা জোনাকী:
বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারায় নারীর অংশগ্রহণ বর্তমানে যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি দৃশ্যমান। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা কার্যক্রম কিংবা সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব—সব ক্ষেত্রেই নারীরা নিজেদের দক্ষতা, যোগ্যতা ও সক্ষমতার স্বাক্ষর রাখছেন। এর ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সমান ও সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হচ্ছে, যা দেশের টেকসই আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকে আরও গতিশীল ও সম্ভাবনাময় করে তুলছে।
তবে বাস্তবতা হলো, দেশের একটি বড় অংশের নারী এখনও দারিদ্র্য, বৈষম্য এবং আর্থ-সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মধ্যে বসবাস করছে, যা সুযোগের সমতাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে তুলছে। এই প্রেক্ষাপটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নারীর ক্ষমতায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে। আর এই কর্মসূচিগুলো হলো এমন সব উদ্যোগ যার মাধ্যমে দারিদ্র্য, অসহায় ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সহায়তা ও বিভিন্ন ধরনের সুবিধা প্রদান করা হয়। যার মধ্যে অন্যতম হলো বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টিমূলক কর্মসূচি (কাবিখা, কাবিটা), ভিজিডি (VGD) এবং ভিজিএফ (VGF) যা নারীদেরকে আর্থিক নিরাপত্তা ও সুযোগের সমতা নিশ্চিতে সহায়তা করছে। বর্তমানে এ কর্মসূচির অন্যতম সংযোজন হলো “ফ্যামিলি কার্ড”। এটি মূলত সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি। যার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করা, যা ছিলো বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম প্রধান বিষয়বস্তু।
এ কর্মসূচির মাধ্যমে দারিদ্র্য ও অসহায় নারীরা অগ্রাধিকার ভিত্তিক সরাসরি আর্থিক ও খাদ্য সহায়তা পেয়ে থাকবে যা তাদের দৈনন্দিন জীবনের চাহিদা পূরণে সহায়ক হবে। অনেক নারী এই সহায়তার অর্থ ব্যবহার করে ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করতে পারে, যা তাদের আত্মনির্ভরশীল হতে সাহায্য করবে। অপরদিকে খাদ্য নিরাপত্তা বা নিরাপদ খাদ্য গ্রহণের সুযোগের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করবে। এছাড়াও শ্রমশক্তিতে নিয়োজিত নারীদের পুনর্বাসনে দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকা পালন করবে। শ্রমশক্তির তথ্যানুসারে, ২০২৪ এর জুন শেষে শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ছিলো ২ কোটি ৪২ লাখ ৪০ হাজার। ২০২৩ সালের জুনে নারীদের এমন সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৫০ লাখ ২০ হাজার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দেশে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা কমেছে ৭ লাখ ৮০ হাজার। অপরদিকে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চার বছরে শুধু সৌদি আরব থেকে ১৫ হাজারের বেশি নারীকর্মী দেশে ফিরেছে। এ বিপুল সংখ্যক নারীদের পুনর্বাসনে ফ্যামিলি কার্ড অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করবে। ফলস্বরূপ নারীরা পরিবার বা সমাজের মুখাপেক্ষী না হয়ে নানারুপ বঞ্চনার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হবে।
অপরদিকে, সমমূল্যের খাদ্য সহায়তা পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের সুযোগ তৈরি করে দিবে, যা পরিবার ও দেশের মানবসম্পদে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) দেওয়া ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস’ প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বে তীব্র খাদ্যসংকটে থাকা ১০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ চতুর্থ এবং দেশের ১০ শতাংশের বেশি মানুষ অপুষ্টির শিকার।
সরকারি SSPS- এর প্রকাশিত “ফ্যামিলি কার্ড ওভারভিউ” এর তথ্যমতে-বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি র মাধ্যমে ধাপে ধাপে সারা দেশের সর্বোচ্চ ২ কোটি পরিবারকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা হবে। এ উদ্যোগের প্রাথমিক পর্যায়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় ৪১ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। “দ্য ডেইলি স্টার” এর বাজেট বিশ্লেষণে বলা হয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থ বছরে ফ্যামিলি কার্ডের জন্য ১৪,৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে যা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মোট বরাদ্দের প্রায় ৯.৭%। এ কর্মসূচীর আওতায় সুবিধাভোগী পরিবারগুলোতে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যের চাহিদা পূরণ, সন্তানদের শিক্ষার খরচ বহন অথবা পরিবারের নারী সদস্যদের ক্ষুদ্র পরিসরে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অধিকন্তু এ কার্ড সমাজের একটি বৃহৎ অংশকে সহজেই আর্থিক খাতে সংযুক্ত করতে পারবে যা আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতের পাশাপাশি আর্থিক সাক্ষরতা অর্জনে অনস্বীকার্য অবদান রাখতে পারবে। এছাড়াও এই কর্মসূচি নারীদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিতেও সহায়ক। যখন একজন নারী সরকারি সুবিধাভোগী হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন এবং নিজেই সেই সুবিধা গ্রহণ ও ব্যবস্থাপনা করেন, তখন সমাজে তার অবস্থান শক্তিশালী হয়। এটি নারীদের আত্মনির্ভরশীলতা ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ফ্যামিলি কার্ড উদ্যোগটি শুধু একটি খাদ্য বা অর্থ সহায়তা কর্মসূচি নয়; এটি দারিদ্য জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন এবং নারীর ক্ষমতায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই উদ্যোগ পরিবার,সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীদেরকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারবে।