বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টি আদৌ কি সম্ভব?

মো: আকতার হোসাইন ।। ব্যাংকার ও কলামিস্ট

২৬ জুন ২০২৬ তারিখের পত্রিকায় একাধিক শিরোনাম ছিল এ রকম— ‘জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ ১৪ বছরের সর্বনিম্ন’, ‘১৬ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম এডিপি বাস্তবায়ন’, ‘সুদ না কমলে বিনিয়োগ বাড়বে না’ ইত্যাদি। এর অর্থ হলো, সরকার বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য বেশ উদ্বিগ্ন। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে কি আদৌ বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হয়েছে?বাংলাদেশ বিশ্বের জনবহুল ক্ষুদ্র একটি দেশ, যেখানে কম দূরত্বে বহু মানুষের বসবাস। সাম্প্রতিক জাতিসংঘের তথ্যমতে, ঢাকা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মেগাসিটি। এই ছোট্ট শহরে ৩ কোটি ৬৬ লাখেরও বেশি মানুষের আবাস, এবং শহরটি তার অপরিসীম জনঘনত্বের জন্য পরিচিত। এখানে শ্রম সহজলভ্য এবং বিশ্বে তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে সস্তা। তবুও কেন যেন বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের জায়গায় নেই বাংলাদেশ। এমনকি দেশের অভ্যন্তরে বেসরকারি বিনিয়োগও বিগত ১৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর কারণ কী?সরকার নিজেই বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য সম্প্রতি মালয়েশিয়া ও চীন সফর করলেন। যদিও মালয়েশিয়া সফরে বিনিয়োগের চেয়ে জনসংখ্যা রপ্তানিকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

সকলেরই প্রত্যাশা, দেশের এই দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে বা স্লথগতির অর্থনীতি থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য এ সফর ছিল যুগান্তকারী। যে কারণে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলও প্রশংসায় হাততালি দিচ্ছে।আমরা দেখেছি, গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য বা বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) আয়োজনে ৭ এপ্রিল ২০২৫ তারিখ থেকে চার দিনব্যাপী বিনিয়োগ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনে অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ ৪০টি দেশের শীর্ষস্থানীয় ৬ শতাধিক দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী। সেখানে ছিল চমৎকার এক উপস্থাপনা। অনেকেই মনে করেছিলেন, এবার দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগে গতি আসবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। কারণ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় দেশি ও বিদেশি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদদের সম্পৃক্ততা ছিল। বিপরীতে বাংলাদেশে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ কতটুকু বৃদ্ধি পেল? যেখানে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ গত ১৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এমন অবস্থায় বৈদেশিক বিনিয়োগ কতটা আশা করা যেতে পারে?গত ২৫ জুন ২০২৬ তারিখে চীনের বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত বিডা কর্তৃক আয়োজিত বিনিয়োগ ফোরামে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিগগিরই চীনে ‘বিনিয়োগ কার্যালয়’ খুলতে যাচ্ছি, যার উদ্দেশ্য খুবই সহজ। চীনা বিনিয়োগকারীদের সহায়তা পাওয়ার জন্য বাংলাদেশে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না। বাংলাদেশেই আপনাদের আরও কাছাকাছি থাকতে, নিয়মিত কথা বলতে এবং আগ্রহ থেকে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করতে আপনাদের সাহায্য করতে চাই। সরকারপ্রধান আরও বলেন, বাংলাদেশ এক বিশাল অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

আমরা আমাদের যাত্রাপথের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি এবং আমি স্পষ্টভাবে বলতে পারি যে, বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত, ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত এবং আমাদের অন্যতম দীর্ঘদিনের ও বিশ্বস্ত বন্ধু চীনের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ এখন বৈশ্বিক ব্যবসার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। বিনিয়োগ আকর্ষণে আমলাতান্ত্রিক জড়তা দূর করতে তার সরকার ইতোমধ্যে ১৮০ দিনের কঠোর কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এখন থেকে মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে নতুন ব্যবসার লাইসেন্স অনুমোদন করা হবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বৈষম্যহীন আচরণ, আমাদের আইন ও প্রবিধান অনুযায়ী মূলধন ও লভ্যাংশ ফেরত এবং শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা আশা করতে পারেন।এখানে দুটি বিষয় নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। একটি হলো, বাংলাদেশ বিনিয়োগের জন্য ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত এবং শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা আশা করা যায়। তার মানে হলো, এই সংশয় দূর করে আরও কাজ করার জায়গা রয়েছে। তবে বর্তমান সরকারের উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম অনেকটাই বিনিয়োগ বৃদ্ধির সহায়ক। তবুও সংশয় থেকেই যায়; বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে তো? কারণ কথায় আছে, আগে নিজের ঘর গোছাতে হয়, তারপর অন্যকে আমন্ত্রণ জানানো যায়। এছাড়া বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম শর্ত হলো দেশীয় বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টি করা, তথা দেশীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়া। যেখানে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবি— শিল্পকল-কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ সরবরাহ করা। সেই দীর্ঘদিনের দাবি আমরা কতটুকু মেটাতে পেরেছি? এছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক অস্থিরতা বিদ্যমান রয়েছে। সিটি গ্রুপের মতো বিশাল একটি গ্রুপ অর্থসংকটে পড়েছে, যেখানে দোষারোপ করা হচ্ছে দেশের ব্যাংকিং খাতকে। আবার বসুন্ধরা গ্রুপকে রাজনৈতিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা হচ্ছে।

এসবের অর্থ কতটুকু বহন করে? দেশের বিনিয়োগ সম্প্রসারণ ঘটাতে হলে আগে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। যেখানে থাকবে না কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা, লাইসেন্সের নামে থাকবে না কোনো হয়রানি, ঘুষ বা চাঁদাবাজির ব্যবস্থা থাকবে না, কর্মপরিবেশ হবে বিনিয়োগ-উপযোগী। তবেই হয়তো দেশীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে।আমরা জানি, সরকার প্রতিবছর বাজেট দেন এবং ওই বাজেটে সরকার নিজে কতটুকু বিনিয়োগ করবেন, তার একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা থাকে। সরকার নিজেই কি তার লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বিনিয়োগ করতে পারেন? সরকার নিজেই চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই–মে) মাত্র ৪৮ শতাংশ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন করেছেন। জুলাই–মের হিসাবে এই বাস্তবায়ন হার গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সরকার নিজে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ ব্যয় করতে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে বেসরকারি বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে আসবে না— এটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া দেশে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং উচ্চ সুদহার বিরাজমান রয়েছে। আবার জ্বালানিসংকটের কারণে দেশের বেসরকারি খাতে প্রাণচাঞ্চল্য নেই। সুতরাং দেশে কীভাবে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে? বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হলে অবশ্যই বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

অন্যথায় দেশে বা দেশের বাইরে সভা-সেমিনার করে কোনো লাভ হবে না।দেশে বিনিয়োগের প্রাণ হিসেবে বিবেচিত করা হয় ব্যাংকিং খাতকে। সেই ব্যাংকিং খাতের করুণ দশা। যেখানে ব্যাংক নিজেই অস্তিত্বসংকটে রয়েছে, সেখানে দেশের অর্থনীতিতে সহায়তা করার মতো সক্ষমতা বর্তমান ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আছে কি? অধিকাংশই বলবে, বর্তমান ব্যাংকিং খাতে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের মতো সহায়তা করার সক্ষমতা নেই। সুতরাং দেশে ব্যাংকিং খাতের সুশাসন ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ-উপযোগী করে গড়ে তোলাই হবে মূল লক্ষ্য। বিনিয়োগ সৃষ্টি করার জন্য শিল্পকল-কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ব্যবস্থা রাখতে হবে। হয়রানি নিরসন করে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস করতে হবে। তবেই হয়তো কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ সম্ভব হবে।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *