
মো: আকতার হোসাইন
ব্যাংকার ও কলামিস্ট
বাংলাদেশ কৃষি প্রধান জনবহুল একটি দেশ। যেখানে বাংলাদেশ একটি সময় সম্পূর্ণরূপে কৃষির উপর নির্ভরশীল ছিলেন এবং এক সময় বাংলাদেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮০ শতাংশের অধিক কর্মসংস্থান ব্যবস্থা ছিল খাতটিতে। কিন্তু আজ কৃষি খাতটিতে কর্মসংস্থানের অবদান ৪৫ দশমিক ৪ শতাংশ (সূত্র: শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২, বিবিএস)। ফলশ্রুতিতে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর বিশাল একটা অংশ বেকার বা ছদ্ম বেকার রয়েছে। আইএলও এর সংজ্ঞা কে সংজ্ঞায়িত না করলে দেশে বেকার আরও কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। অথচ কৃষি খাতটির আধুনিকায়ন করে বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। কিন্তু কৃষি খাতটি উপেক্ষিত হওয়ায় দেশে বেকারত্বের সংখ্যা বেড়ে গেছে। মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি)তে কৃষি খাতের অবদান ছিল সর্বোচ্চ পরিমাণ। অথচ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০২৪ (২০২৩-২৪ অর্থবছর) অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষি খাতের অবদান ১১.০২ শতাংশ। দেশের বেকারত্ব দূর করতে হলে এবং দেশের অর্থনীতিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে হলে কৃষি ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিয়ে- সমন্বয় বড়ই জরুরী।
বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ হলেও কৃষি সম্প্রসারণে বা কৃষির আধুনিকায়নে সরকার যেন মনোযোগী একটু কম। যে কারণে দেশের মোট চাহিদার তুলনায় বেশি পরিমাণ পিঁয়াজ উৎপাদন করার পরেও সেই পেঁয়াজ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। সুতরাং বিষয়টিতে সরকারের পক্ষ থেকে অধিকতর তদারকি এবং অধিক পরিমাণ মনোযোগী হওয়া উচিত। কারণ- পেঁয়াজ একটি অতিদ্রুত পচনশীল এবং মসলা জাতীয় ফসল। বাংলাদেশের ঠিক কত পরিমাণ পেঁয়াজ উৎপাদিত হয় এবং এর কত পরিমাণ চাহিদা রয়েছে— যেখানে সুনির্দিষ্ট তথ্যে কৃষি বিভাগ ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর মধ্যে গরমিল রয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি বিভাগের হিসাবে গত অর্থবছরে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে ৩৯ লাখ টন। পরিসংখ্যান ব্যুরো কৃষি বিভাগের হিসাব থেকে ২৫ শতাংশ বাজারজাতজনিত ক্ষতি বাদ দিয়ে হিসাব করে। তাদের হিসাবে, গত অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদিত হয় ২৯ লাখ ১৭ হাজার টন। আবার ট্যারিফ কমিশনের হিসাবে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা ২৬ থেকে ২৭ লাখ টন (প্রথম আলো, মার্চ ২৪, ২০২৫)। অপর এক তথ্যে বলা হয়েছে, দেশীয় উৎপাদিত পেঁয়াজের পরিমাণ ৩৫ লাখ টন এবং চাহিদা ২৪ লাখ টন। এসব পরিসংখ্যান থেকে খুব সহজেই প্রতীয়মান হয় যে, আমাদের দেশে পেঁয়াজের চাহিদার তুলনায় উৎপাদন অনেক বেশি। কিন্তু পেঁয়াজ পচনশীল হওয়ায় এবং সঠিক সংরক্ষণাগারের অভাবে ২৫ শতাংশ বা তার অধিক পেঁয়াজ পচে যায়। ফলে সৃষ্টি হয় পেঁয়াজের সংকট এবং বিপরীতে বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়। এতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা (ডলার) ব্যয় হয়। বিপরীতে জাতীয় অর্থনীতি সংকটে পড়ে। একই সঙ্গে বেকারত্ব জাতীয় অর্থনীতিকে গ্রাস করে। তাই সরকারের উচিত খাতটিতে যথাযথ নজর দেয়া এবং খাতটিকে আধুনিকায়ন করে সকল দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে দেশী উৎপাদন দিয়ে দেশের চাহিদা সম্পূর্ণ করা।
নতুন এক সম্ভবনাময় খাত হলো আম রপ্তানি। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি আম উৎপাদন করে ভারত। তবে রপ্তানির দৌড়ে সবার আগে মেক্সিকো। বিশ্বে আম উৎপাদনে শীর্ষ দশে থাকলেও রপ্তানিতে তলানিতে বাংলাদেশের অবস্থান। এবছর সুস্বাদু ফল আমের বাম্পার উৎপাদন ও রপ্তানিতে এবার রেকর্ড গড়ার পথে ছিলো বাংলাদেশও। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে আম উৎপাদিত হয়েছে ২৪ লাখ টন। এর মধ্যে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৩২১ টন। বাংলাদেশ থেকে আগের বছরে ২১টি দেশে আম রপ্তানি হয়েছিল। এর মধ্যে যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ইতালি ও সিঙ্গাপুরের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের আরো কয়েকটি দেশ রয়েছে। বিগত মৌসুমে প্রায় দুই লাখ পাঁচ হাজার হেক্টর জমিতে ২৭ লাখ মেট্রিক টনের বেশি আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে বিদেশে পাঁচ হাজার মেট্রিক টন আম রপ্তানির আশা করছিল সংশ্লিষ্ট দপ্তর। গত বারে আমের নতুন বাজার হলো চীন। বিগত মৌসুমে চীনেও রপ্তানি হয়েছিল ১০০ টনের বেশি আম। সাতক্ষীরা ও যশোর অঞ্চলের আম দিয়েই গত মে ২৯, ২০২৫ তারিখে প্রথম চালান রপ্তানি করা হয় চীনে। তাই এই খাতটিতে আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে সরকারকে। আরও নতুন নতুন বাজার তৈরি করতে হবে আম রপ্তানির জন্য। আমের ক্ষেত্রেও সরকার বেশ উদাসীন। উৎপাদনে শীর্ষ দশে থাকলেও রপ্তানিতে একেবারেই অবস্থান নেই বললেই চলে। অথচ সরকার একটু মনোযোগী হলে এ খাতটি থেকেও রপ্তানি বাণিজ্যের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। আরও সম্ভব নতুন নতুন কর্মসংস্থানের।
বিগত বছর আবহাওয়া অনুকূল এবং গত কয়েক বছরে আলুচাষিরা ভালো দাম পাওয়ায় আলুর ব্যাপক চাষাবাদের ফলে, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি পরিমাণ ফলন হয়েছে। যা দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে। অথচ গত বছরেও ভারত কারণে অকারণে আলু, পেঁয়াজ বন্ধ করার হুমকি দিয়েছিল এবং তারা বলে আমরা আলু পেঁয়াজের বাজার বন্ধ করলে বাংলাদেশের বাজার অস্থিতিশীল হবে। কিন্তু ঘটে ছিলো তার উল্টো, বাংলাদেশ ওবার নিজেই আলু রপ্তানি করছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, বিগত অর্থবছরের ১৫ মার্চ পর্যন্ত প্রায় ২৪ হাজার টন আলু রপ্তানি হয়েছে। এটি আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। শুধু ফেব্রুয়ারিতেই প্রায় ১২ হাজার টন আলু রপ্তানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের মোট রপ্তানির সমান। বিগত বছর নেপাল, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে প্রায় নয় হাজার টন আলু রপ্তানি হয়েছে। গত অর্থবছরের মোট রপ্তানির তুলনায় চলতি অর্থবছরে রপ্তানি প্রায় ৮০ শতাংশ। অথচ সদ্য সমাপ্ত হওয়া আলুর সিজন শেষে আলু চাষিরা কোল্ড স্টোরেজ থেকে আলু আনতে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন। কারণ ওই আলু বাইরে নিয়ে এসে বিক্রি করলেও কোল্ড স্টোরেজের ভাড়া মেটানো সম্ভব নয়। এর প্রভাব চলতি আলু সিজনেও দেখা যাচ্ছে—নতুন আলুর দাম সাধারণ ক্রেতার হাতের নাগালের মধ্যেই রয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কৃষকরা আলুর যে দাম পাচ্ছেন, তাতে চাষিদের উৎপাদন খরচ মেটানো কঠিন হবে। এই অবস্থা চলতে থাকলে আগামী বছর আলু চাষে চাষিরা নিরুৎসাহিত হবেন। ফলে আলুর চাহিদার তুলনায় জোগান ঘাটতিতে পড়বে এবং আলুর দাম সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। সুতরাং সরকার যদি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নজর না রাখে, তাহলে চাষি ও ক্রেতা বা ভোক্তা—উভয়ের জন্যই সংকট তৈরি হবে, যা রাষ্ট্রের জন্য মঙ্গলজনক নয়। তখন ঔই আলু আবার বিদেশ হতে আমদানি করতে হবে।
বাংলাদেশের জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় প্রতিটি ভোগ্য কৃষিপণ্যই (যেমন ধান, গম, তেলবীজ, ডাল ইত্যাদি) আমদানি করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রেই পার্শ্ববর্তী দেশের প্রতি বাংলাদেশের নির্ভরশীলতা অত্যধিক হয়ে থাকে, যা অনেক সময় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হিসেবে কাজ করে। তাই বাংলাদেশের জমিকে এবং কর্মক্ষম তরুণ সমাজকে কাজে লাগানোর এখনই মোক্ষম সময়। বাংলাদেশে শস্যচক্র বিবেচনা করলে দেখা যায়, আমন ধান কাটার পর অনেক জমি অনাবাদি পড়ে থাকে। এই সময়টাতে যদি অনাবাদি জমিগুলোকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো যায়, তাহলে দেশে খাদ্যপণ্য আমদানি অনেক ক্ষেত্রেই কমে যাবে। এছাড়াও রাস্তার দু’ধারে গাছ লাগানোর পাশাপাশি ডালজাতীয় ফসল পরিকল্পিতভাবে চাষ করা সম্ভব এবং সে ক্ষেত্রে ভালো ফলন আশা করা যায়। ফলে দেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে, বেকারত্ব কমে যাবে, আমদানি নির্ভরতা হ্রাস পাবে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পাবে এবং চলতি হিসাব উদ্বৃত্ত থাকবে। সুতরাং কৃষি ক্ষেত্রে সমন্বয় অবশ্যম্ভাবী এবং এটি সময়ের দাবি।