জলবায়ু ঝুঁকিতে হাওরের কৃষি: বিকল্প ফসল হিসেবে সরিষা

বাকৃবি প্রতিনিধি

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অঞ্চল প্রতিবছরই কৃষি ঝুঁকির মুখে পড়ে। বর্ষাকালে সম্পূর্ণ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এখানকার প্রধান ফসল বোরো ধান আগাম বন্যা, শিলাবৃষ্টি ও ঠান্ডাজনিত চাপের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই পরিস্থিতিতে হাওর অঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি সরিষা চাষ নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর ও বোরো রোপণের আগের পতিত সময়ে সরিষা আবাদ করলে কৃষকরা অতিরিক্ত ফসলের পাশাপাশি আর্থিক ঝুঁকি কমাতে পারবেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) এক গবেষণায় উঠে এসেছে এ তথ্য।

সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার কুড়ারকান্দি এলাকায় প্রকল্পের মাঠ দিবসে গবেষণার ফল তুলে ধরেন প্রধান গবেষক বাকৃবির কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. মমিনুল ইসলাম। ‘কৃষকদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলে বিদ্যমান পতিত–বোরো–পতিত ফসল ক্রমে সরিষা প্রবর্তন’ প্রকল্পটি ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেমের (বাউরেস) তত্ত্বাবধানে এবং সিটি ব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

কৃষিতত্ত্ব বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. আহমদ খায়রুল হাসানের সভাপতিত্বে মাঠ দিবসে উপস্থিত ছিলেন বাকৃবি রিসার্চ সিস্টেমের (বাউরেস) পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হাম্মাদুর রহমান, বাউরেসের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. পরেশ কুমার সাহা, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওবায়দুল ইসলাম খান অপু এবং অতিরিক্ত উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহাবুব আলমসহ স্থানীয় কৃষকবৃন্দ।

গবেষকবৃন্দ জানান, এই অঞ্চলে উচ্চফলনশীল বোরো ধান উৎপাদনের প্রধান বাধা হলো আগাম বন্যা, শিলাবৃষ্টি ও খরা। বোরো ধান চাষে আরেকটি বড় সমস্যা হলো ঠান্ডাজনিত চাপ। যদি ডিসেম্বরের আগে বোরো ধান রোপণ করা হয়, তবে প্রজনন পর্যায়ে (ফুল আসার সময়) ঠান্ডার কারণে শীষে দানা বন্ধ্যা হয়ে যায়। অন্যদিকে ডিসেম্বরের পরে রোপণ করলে বেশিরভাগ সময় ধান পাকতে পাকতেই আগাম আকস্মিক বন্যায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। ফলে হাওর অঞ্চলে বোরো ধান উৎপাদন এক ধরনের জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে পড়ে থাকে। এই সংকট মোকাবিলায় বিকল্প ও নিরাপদ শস্যক্রম খুঁজে বের করা জরুরি হয়ে উঠেছে। হাওর অঞ্চলে সবচেয়ে প্রচলিত শস্যক্রম হলো পতিত–বোরো–পতিত, যা মোট আবাদি জমির প্রায় ৪০ শতাংশ জুড়ে রয়েছে। ফলে রবি মৌসুমে বিপুল জমি পতিত পড়ে থাকে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর এবং বোরো ধান রোপণের আগের সময়টুকুতে স্বল্পমেয়াদি সরিষা চাষের মাধ্যমে একটি অতিরিক্ত ফসল অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। এতে কৃষকরা অন্তত একটি ফসল নিশ্চিতভাবে ঘরে তুলতে পারবেন, এমনকি বোরো ধান যদি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তও হয়।

তারা আরও জানান, কিশোরগঞ্জ জেলার ১৩টি উপজেলার মধ্যে চারটি উপজেলা—ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলী—সম্পূর্ণভাবে হাওরবেষ্টিত এবং আরও পাঁচটি উপজেলা আংশিকভাবে হাওর অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। এসব এলাকার মানুষ প্রধানত কৃষিনির্ভর এবং জীবিকার জন্য পুরোপুরি কৃষিজমির ওপর নির্ভরশীল। হাওর এলাকার কৃষকরা তাদের বোরো ফসলকে অনেক সময়ই “ভাগ্যের ফসল” হিসেবে বিবেচনা করেন, কারণ প্রায় কয়েক বছর পরপর ধান পাকতে শুরু করার সময় আকস্মিক বন্যা দেখা দেয় এবং সম্পূর্ণ ফসল নষ্ট হয়ে যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্যার আক্রমণ আরও অনিয়মিত ও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। ফলে কৃষি উৎপাদনে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে এবং এর প্রভাব জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুতরভাবে পড়ছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৪, ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০০৪, ২০১০ এবং সর্বশেষ ২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যা হাওর অঞ্চলে অপূরণীয় ক্ষতির সৃষ্টি করেছে। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে প্রকল্পটি বিগত প্রায় তিন বছর যাবৎ পরিচালিত হচ্ছে।

গবেষণার বিষয়ে তারা বলেন, গবেষণার প্রথম বছর (২০২৩–২০২৪) বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ও বাংলাদেশ পরমাণু গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) উদ্ভাবিত ছয়টি স্বল্পমেয়াদি সরিষার জাত তিনটি বপন সময়ে (১০, ২০ ও ৩০ নভেম্বর) পরীক্ষা করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, ২০ নভেম্বর বপনে বিনা সরিষা–৯ সর্বোচ্চ ফলন দেয়, যার কাছাকাছি ফলন দেয় বারি সরিষা–১৭। সরিষার পরবর্তী ধান (ব্রি ধান–১০০) গড়ে ৬.২ টন প্রতি হেক্টরে ফলন দেয়, যা শস্যক্রমকে লাভজনক হিসেবে তুলে ধরে। দ্বিতীয় বছর (২০২৪–২০২৫) গবেষণায় নির্বাচিত দুটি জাত—বিনা সরিষা–৯ ও বারি সরিষা–১৭—কে বিভিন্ন সার ও বীজহার ব্যবস্থাপনায় পরীক্ষা করা হয়। প্রস্তাবিত বীজহার (৮ কেজি প্রতি হেক্টর) ও সারমাত্রা (১০০ শতাংশ) প্রয়োগে সর্বোচ্চ ফলন পাওয়া গেছে বিনা সরিষা–৯ থেকে। সরিষার পর হাইব্রিড বোরো ধান (সবুজ সাথী) গড়ে ৬.৪ টন প্রতি হেক্টরে ফলন দেয় এবং পুরো শস্যক্রমে ধান সমতুল্য ফলন দাঁড়ায় ১০.১ টন প্রতি হেক্টর। গবেষণার তৃতীয় বছর (২০২৫–২০২৬) বর্তমানে চলমান। আমরা আশা করি, এটি বাস্তবায়িত হলে হাওর অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন ও কৃষকের আয় দুটোই বাড়বে এবং জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যেও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

গবেষকরা জানান, হাওর অঞ্চলে সরিষা চাষের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো প্রতি বছর একই সময়ে পানি না নামায় বপনের সময় নির্ধারণে জটিলতা। এছাড়া হাওরের সব জমি সরিষা চাষের উপযোগী নয়—উঁচু ও মাঝারি উঁচু বা কান্দা এলাকার জমিই তুলনামূলকভাবে বেশি উপযোগী। অক্টোবরের শেষ ও নভেম্বরের শুরুতে অনাকাঙ্ক্ষিত বৃষ্টিও সরিষার বপন ও প্রাথমিক বৃদ্ধিতে বড় বাধা সৃষ্টি করে।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গবেষকরা আরও স্বল্পমেয়াদি ও দ্রুত পরিপক্ব সরিষার জাত উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী জমি থেকে সেচের পানি ঢুকে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জমির ধরন ও ঝুঁকি বিবেচনায় কৃষকদের একত্রিত করে কমিউনিটি ফার্মিং চালুর পরামর্শ দেন তারা।

এবার গবেষণার অংশ হিসেবে দেওয়া বিনা সরিষা–৯ চাষ করেছেন হাসন রাজা। তিনি জানান, হাওরের কিছু উঁচু জায়গা রয়েছে। এসব জায়গায় পানি আসে না। আগে ভুট্টা চাষ করতাম, কিন্তু ক্ষতি হওয়ায় এখন সরিষা করছি। লাভের আশা করছি। এখন আমাদের দেখাদেখি অনেকেই সরিষা চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছে। হাওরে এখন সরিষা নতুন ফসল হিসেবে প্রচলিত হচ্ছে।

নজরুল ইসলাম নামের আরেকজন কৃষক বলেন, আমি তিন বছর যাবৎ সরিষা চাষ করি এবং সরিষার তেল ব্যবহার করছি। আমার নিজেরই গ্যাসের সমস্যা ছিল, সরিষার তেল ব্যবহার করে এখন সমাধান হয়েছে। নিজে সরিষা ভাঙিয়ে স্বাস্থ্যকর তেল ব্যবহার করতে পারছি—এটাই বড় লাভ বলে আমি মনে করি।

অতিরিক্ত উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহাবুব আলম বলেন, আমরা হাওরের উন্নয়নে অত্যন্ত আন্তরিক। আমরা ঘোষণা করেছি যে এখানে কোনো কৃষক যদি ধানের পরিবর্তে সরিষা চাষ করতে চান, তাহলে আমরা বিনামূল্যে বীজ ও সার দেব। সরিষা স্বাস্থ্যের জন্য যেমন উপযোগী, অন্যদিকে সরিষার উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে দেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে। সরিষা মাটির উর্বরতাও বৃদ্ধি করে। এজন্য যত্ন সহকারে সরিষা চাষে গুরুত্ব দিতে হবে।

বাকৃবি রিসার্চ সিস্টেমের (বাউরেস) পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হাম্মাদুর রহমান বলেন, ১৫ বছরে হাওরের অনেক কিছু পরিবর্তন হয়েছে। আগে শুধু ধান চাষ হতো, এখন ভুট্টা ও সরিষাও হচ্ছে। জমিকে যত বেশি ব্যবহার করা যাবে, ততই বেশি পাওয়া যাবে। শুধু ধান চাষ করে বসে থাকলে হবে না; বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজিও সঙ্গে চাষ করতে হবে। সরিষার চাষ এখন হাওরে লাভের মুখ দেখছে। এ গবেষণার মাধ্যমে হাওরের সরিষা সারা দেশে বিস্তার লাভ করবে বলে আশা করছি।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *