
মো: আকতার হোসাইন //ব্যাংকার ও কলামিস্ট:
একটি দেশের সুখী ও সমৃদ্ধশালী হওয়ার পেছনে যে উপাদানটি কাজ করে, তা হলো শিক্ষা। অর্থাৎ, দেশকে সুশৃঙ্খল জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে হলে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। জাতি শিক্ষিত হলে দেশের উন্নয়ন খুব স্বাভাবিকভাবেই সুশৃঙ্খলভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু শিক্ষাই যদি হয় নড়বড়ে, গড়পড়তা, মানহীন ও দায়সারা গোছের, তাহলে ওই দেশ কীভাবে বিশ্বে মাথা তুলে দাঁড়াবে? কীভাবেই বা ওই দেশের নাগরিকরা নিজেদের অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হবে? সুতরাং শিক্ষা পদ্ধতিকে একটি সুসংগঠিত কাঠামোর মধ্যে নির্ধারণ করতে হবে, যেখানে প্রতিটি মানুষ সুশিক্ষায় শিক্ষিত হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় কোনো প্রকার ফাঁকফোকর বা দায়িত্বে অবহেলা করার মতো সুযোগ দেওয়া যাবে না। শিক্ষা ব্যবস্থাটি হতে হবে কঠোর ও নমনীয়—যা দেশ ও জাতি গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।
শিক্ষা নিয়ে মনীষীদের বাণীর শেষ নেই। প্রত্যেকটি বাণীই একটি জাতি গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। শিক্ষা নিয়ে এতটা ছলচাতুরি বা দায়িত্বে অবহেলা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে আছে কি না, তা সন্দেহাতীত। আমাদের দেশে শিক্ষা ব্যবস্থায় দেখা যায়, স্কুল-কলেজগুলোতে শুধুই ছুটি আর ছুটি; এছাড়াও রয়েছে শিক্ষকদের দায়িত্বে অবহেলা। যেখানে দুই ঈদ এবং শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন ছুটি মিলিয়ে প্রায় দুই মাস বন্ধ থাকে। আবার দেখা যায়, ০৯ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ছুটির তালিকা প্রকাশ করে, যেখানে সাধারণ ছুটি ১৪ দিন এবং নির্বাহী আদেশে ছুটি ১৪ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। এই ছুটিগুলো অফিস-আদালতের পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও ভোগ করে থাকে। কিন্তু ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে জারি করা শিক্ষা ক্যালেন্ডারে দেখা যায়, বিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ৬৪ দিন বন্ধ রয়েছে, অর্থাৎ প্রায় দুই মাসের বেশি। এরপরও যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাপ্তাহিক ছুটি দুই দিন দেওয়া হয়, তাহলে মোট ছুটির সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৪+১০৪, অর্থাৎ ১৬৮ দিন। কিন্তু এরপরেও রয়েছে গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন ছুটি। যদি ৩৬৫ দিন থেকে ১৬৮ দিন বাদ দেওয়া হয়, তাহলে দেখা যায়, ২০০ দিনেরও কম সময় ছাত্রছাত্রীদের নিয়মিতভাবে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করা হয়। এই ২০০ দিনের কম সময়ে আদৌ কি পুরো সিলেবাস সম্পন্ন করা সম্ভব? যদি হয়ও, তা কতটুকু মানসম্মত? সুতরাং বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে, এটি আদৌ কতটুকু যুক্তিসঙ্গত—তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।
শিক্ষা যেখানে একটি মৌলিক বিষয়, সেখানে সেই শিক্ষাকে নিয়ে এমন স্পর্শকাতর চিন্তাভাবনা কতটা যৌক্তিক? অর্থাৎ, শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি আদৌ কি প্রয়োজন? অনেকেই বলতে পারেন, অফিস-আদালত সপ্তাহে দুই দিন ছুটি পেলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেন নয়। তবে যারা শিক্ষকতা করেন, তারা বলতেই পারেন—অন্যান্য পেশার লোকজন শনিবারে ছুটি পেলে আমরা কেন নয়? তাদেরকে এও মনে রাখতে হবে, কিছু পেশার মানুষ ঈদের দিনও ছুটি পান না; যেমন—পুলিশ বা প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য, ডাক্তার ও সাংবাদিক। এই পেশাগুলোর মানুষদের ঈদের দিনেও ছুটি মেলে না। তারপরও বিষয়টি আসলে তা নয়। কারণ অফিস-আদালত জাতি গড়ার দায়িত্ব গ্রহণ করেনি। শিক্ষা ব্যবস্থাকেই উন্নত জাতি গড়ার আতুরঘর হিসেবে বিবেচনা করা যায়, যা অন্য কিছুর সঙ্গে তুলনা করা সম্ভব নয়। সুতরাং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তাই এটিকে নিয়ে ছলচাতুরি করার কোনো সুযোগ নেই।
এরপরও রয়েছে সময়ের একটি ব্যবধান। যেখানে অফিস-আদালতগুলো সকাল ৯টায় খুলে এবং কর্মঘণ্টা চলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। অপরদিকে বিদ্যালয়গুলো সকাল ১০টায় শুরু হয়ে চলে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। এর মাঝে আবার টিফিন বিরতি থাকে। আমাদের দেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সবার আগে বিদ্যালয়গুলোই বন্ধ ঘোষণা করা হয়। হরতাল বা অবরোধের মতো পরিস্থিতিতেও সবার আগে বিদ্যালয়গুলো বন্ধ করা হয়, যা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এভাবে দেখা যায় না। সুতরাং সব সমস্যায় বিদ্যালয় বন্ধ করলেই সমাধান হবে—এমনটা নয়। সবার আগে শিক্ষাকে প্রাধান্য দিতে হবে। প্রাধান্য দিতে হবে—জাতিকে কোন পর্যায়ে এবং কীভাবে শক্তিশালী করা যায়, সেই বিষয়ে। যদি এভাবে বারবার বন্ধ বা সাধারণ ছুটি দেওয়া হয়, তাহলে কি তা সম্ভব হবে? হয়তো হবে, আবার নাও হতে পারে। কিন্তু সম্ভব হলেও, তা কতটুকু মজবুতভাবে একটি শক্তিশালী জাতি হিসেবে গড়ে উঠবে—সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
এবার একটু ব্যাখ্যা করা যায় শিক্ষার তিনটি স্তর নিয়ে। কোন পর্যায়ে কেমন—চলুন দেখা যাক। প্রাথমিক স্তরে শিক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক। আর নাজুক হওয়াই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে কিন্ডারগার্ড। এই কিন্ডারগার্ডগুলোতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকের সন্তান পড়ালেখা করে। উদাহরণ হিসেবে একটি বিদ্যালয়ের দুর্বল অবস্থার একটি দৃশ্য তুলে ধরছি। কুড়িগ্রাম জেলার অন্তর্গত ভুরুঙ্গামারী উপজেলায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দায় দেখা যায়, গম কেটে ওই বারান্দায় স্তুপ করে রাখা হয়েছে। বিদ্যালয়টির অর্ধেক বারান্দাই গমে ভরপুর। পরে আশেপাশে খোঁজ নিয়ে জানলাম, বিদ্যালয়টির রাস্তাঘাট কিছুটা দুর্গম হওয়ায় শিক্ষকরা এগারোটা বা বারোটায় হাজিরা দিয়ে একটি বা দুটি ক্লাস নিয়ে ফিরে যান। এই ধরনের শিক্ষার বাস্তব চিত্র সারা বাংলাদেশে প্রায় একই রকম। প্রমাণস্বরূপ আমার কাছে এর ছবি রয়েছে।
এরপর আসা যাক মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে। এখানে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বা বিদ্যালয় সম্পর্কিত খুব বেশি অভিযোগ নেই, তবে এক্ষেত্রে রয়েছে কোচিং বাণিজ্য। শিক্ষকদের ছুটির সুযোগ ও সুবিধা যথাযথ বলে মনে হয়। একজন শিক্ষককে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত টানা ক্লাস নিতে হয় না; মাঝখানে টিফিনের সময় এবং একাধিক ক্লাসের বিরতিও থাকে। এনটিআরসির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হওয়ায় কিছুটা স্বস্তি এসেছে, তবে নজরদারি আরও বৃদ্ধি করার প্রয়োজন রয়েছে।
এবার কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসা যাক। এখানে শিক্ষকরা অন্যরকম সুবিধা ভোগ করেন। অধিকাংশ শিক্ষক শিক্ষকতার পাশাপাশি অন্য কিছু করার সুযোগ পান। কারণ একজন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের ক্লাস সপ্তাহে প্রতিদিনই নেই। কিন্তু তারপরও ক্লাসে পাঠদানে আরও বেশি মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। কারণ প্রত্যেক শিক্ষকই জাতি গঠনের কারিগর, এবং কারিগরের ভুল বা অবহেলার সুযোগ নেই। তবে এর পাশাপাশি, তাদের যথাযথ মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে বেতন কাঠামোও পুনর্বিন্যাস করা উচিত।
বর্তমান সরকারের প্রতি যেমন মানুষের আস্থা রয়েছে, তার চেয়েও বেশি আস্থা রয়েছে বর্তমান শিক্ষা মন্ত্রীর প্রতি। কারণ বিগত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় শিক্ষা খাত সবচেয়ে নড়বড়ে অবস্থায় ছিল। কখনো ফিনল্যান্ডের শিক্ষা ব্যবস্থা, আবার কখনো গুগল ট্রান্সলেট ব্যবহার করে বইগুলোকে হুবহু কপি করাই ছিল বিগত সরকারের শিক্ষাব্যবস্থা। এটি বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে কতটা যুগোপযোগী ছিল, তা ভাবার বিষয়।
বিগত সরকারের শিক্ষাব্যবস্থার ঘন ঘন পরিবর্তনের ফলে শিক্ষা ব্যবস্থায় এক অচল অবস্থা তৈরি হয়েছিল। সেখান থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে হবে এবং গড়ে তুলতে হবে যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা। যেখানে শিক্ষা প্রতিটি মানুষের মনন-মগজে একটি স্থায়ী কাঠামো হিসেবে স্থাপন হবে, যা থাকবে নমনীয় কিন্তু কার্যকারিতা থাকবে শতভাগ কঠোর। এই শিক্ষার মাধ্যমে আগামীর ভবিষ্যৎ দারিদ্র্যমুক্ত হবে, বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্ত থাকবে এবং ন্যায় ও নীতির প্রতি সবাই সচেষ্ট থাকবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্ব দিতে হবে—কারণে বা অকারণে, বুঝে বা না বুঝে খুব সহজেই বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা যাবে না। যদি সপ্তাহে সাপ্তাহিক ছুটি দুই দিন রাখা হয়, তবে তাও যেন যৌক্তিক পর্যায়ে হয়। অর্থাৎ শিক্ষকদের এবং শিক্ষা কাঠামোর সাথে যুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তিকে স্বপ্রণোদিত হয়ে নিজ কাজে সচেষ্ট থাকতে হবে। রাষ্ট্র সেই বিষয়টি নিশ্চিত করবে।