টিসিবি পণ্য বিতরণ নামেই স্বস্তি, কাজে প্রহসন

মো: আকতার হোসাইন ।। ব্যাংকার ও কলামিস্ট :
পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে দেশে অসাধু ব্যবসায়ীরা যেন নিত্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে ৫টি নিত্যপণ্যের দাম সহনশীল রাখতে এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষের মধ্যে স্বস্তি দিতে অল্প টাকায় বিগত সময়ের ন্যায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ, সংক্ষেপে টিসিবি।
বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিতে এক অভিশাপ হলো মূল্যস্ফীতি। মূল্যস্ফীতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীসহ সকল শ্রেণির মানুষের জন্য এক ধরনের করের মতো। সাধারণত করব্যবস্থা বিত্তশালীদের ওপর আরোপ করা হলেও মূল্যস্ফীতি সবার ওপর একই রূপ প্রভাব ফেলে; তবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য এটি মরার ওপর খাঁড়ার ঘা-এর মতো। মূল্যস্ফীতি এখনো ৮ শতাংশের বেশি। পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি এখন বাংলাদেশেই। এ কারণেই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য এই বিশেষ সুবিধা প্রদান করা হয়। এটি সাধারণত তখনই করা হয়, যখন মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের উপরে থাকে অথবা দেশের অর্থনীতিতে টালমাটাল অবস্থা বিরাজমান থাকে। বর্তমান বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের অভাবে দেশে বেকারত্বের হার দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, পাশাপাশি দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ হ্রাস পাচ্ছে।
“বাংলাদেশ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) নিট প্রবাহ কমেছে ৪০ দশমিক ৭১ শতাংশ। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বেসরকারি খাতে ৬৬ হাজার ৫৭ কোটি টাকার দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব বিডায় নিবন্ধিত হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৫৮ শতাংশ কম” (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬)। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় মানুষ কর্মসংস্থান হারাচ্ছে। বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের অভাবের ফলশ্রুতিতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কয়েক গুণ হ্রাস পেয়েছে। সরকার তাই নিম্নবিত্ত পরিবারের মানুষের কথা বিবেচনায় নিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় টিসিবির মাধ্যমে কম দামে পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করেছে। ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের কারণে বাজারে ঊর্ধ্বগতির দ্রব্যমূল্যের তুলনায় খানিকটা কম দামে তেল, ডাল, চিনি এবং ছোলা–খেজুর বিক্রি করা হচ্ছে। তবে এবার আরও যে পণ্য বিক্রি হচ্ছে ডিম, দুধ ও মাংস।
নির্দিষ্ট কিছু পয়েন্ট বিবেচনায় টিসিবির পক্ষ থেকে ট্রাকের মাধ্যমে এসব পণ্য সাশ্রয়ী মূল্যে বিভিন্ন পরিমাণে পাঁচটি পণ্য ৫৯০ টাকায় প্যাকেজ হিসাবে বিক্রি করা হচ্ছে। প্যাকেজের মধ্যে রয়েছে ২ লিটার সয়াবিন তেল ২০০ টাকায়, এক কেজি মসুর ডাল ১২০ টাকায়, ১ কেজি চিনি ৭০ টাকায়, ২ কেজি ছোলা ১২০ টাকায় এবং আধা কেজি খেজুর ৮০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এছাড়াও রোজা উপলক্ষে সুলভ মূল্যে অর্থাৎ ৬৫০ টাকায় এক কেজি গরুর মাংস বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। রাজধানীর ২৫টি স্থানে এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে। মাংসের পাশাপাশি ডিম–দুধও বিক্রি করা হচ্ছে। প্রতিটি ডিম ৮ টাকা বা ৯৬ টাকা ডজন ও প্রতি লিটার দুধ ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর ড্রেসড ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ২৪৫ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। ২৫ রমজান পর্যন্ত মোট ২৬ দিন সুলভ মূল্যে মাংস, ডিম–দুধ বিক্রি চলবে। একজন ক্রেতা এক কেজি গরুর মাংস, একটি মুরগি, এক লিটার দুধ এবং এক-দুই ডজন ডিম কিনতে পারছেন।
এসব পণ্য কিনতে টিসিবির ট্রাকের পেছনে ছুটছে স্বল্প আয়ের মানুষজন। চাহিদার তুলনায় ট্রাকে পণ্য খুবই কম থাকে বলে, ভর্তুকিমূল্যে টিসিবির পণ্য কিনতে স্বল্প আয়ের মানুষের ভিড় এতটাই বেশি যে, কে কার আগে পণ্য কিনতে পারবে—সে জন্য মানুষের বিশাল লাইন দৃশ্যমান হয়। কোথাও কোথাও বিশৃঙ্খলার কারণে লাইনে দাঁড়ানো মানুষের মধ্যে হাতাহাতি পর্যন্ত হয়। পণ্য দেওয়ার পয়েন্টগুলো আগে থেকেই জানিয়ে দেওয়া হয় বিধায় টিসিবির পণ্য সংগ্রহের আশায় কেউ কেউ ভোর রাত থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে। প্রথমে দীর্ঘমেয়াদি টিসিবির কার্ডধারীদের এসব পণ্য সরবরাহ করা হয়, অতঃপর টিকিট বা টোকেন কিনে টিসিবির পণ্য ক্রয় করতে হয়। এবার একটি পয়েন্টে ট্রাক থেকে ৪০০ জন সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য ক্রয় করতে পারেন। তবে নির্দিষ্ট পয়েন্টে টিসিবির ট্রাকটি কখনো কখনো দশটার পর আসে, কোথাও কোথাও আরও পরে আসে, আবার কোথাও কোথাও একটি নির্দিষ্ট সময় থাকলেও সেই সময়ের পরে আসে। সরকার স্বল্প আয়ের মানুষের কথা চিন্তা করে যে উদ্যোগটি নিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়; কিন্তু এই পণ্য কিনতে মানুষের সময় ক্ষেপণ করতে হয়, ফলে শ্রমঘণ্টা নষ্ট হয়। যদিও আমাদের দেশে কর্মের অভাব থাকায় কেউ শ্রমঘণ্টার বিষয়টি তেমনভাবে চিন্তা করে না। স্বল্প বা মধ্যম আয়ের মানুষ চিন্তা করে কীভাবে কম মূল্যে পণ্য ক্রয় করতে পারবে, যাতে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে মানুষের দু–এক পয়সার সাশ্রয় হয়। যেখানে নিম্নবিত্ত মানুষের আয়ের ওপর সংসার চালানো বেজায় কষ্টকর।
অর্থনীতির ভাষায়, কম দামে পণ্য খোঁজার ব্যয়কে সুকতলার ব্যয় বলা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে সুকতলা বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক, বিশেষত টিসিবির পণ্যের ক্ষেত্রে। সুকতলা অপ্রাসঙ্গিক এই কারণে যে, সুকতলা অর্থ হলো পণ্যের মান সম্পর্কে অনুসন্ধানের জন্য যে বাড়তি খরচ এবং শারীরিক ও মানসিক কষ্ট সহ্য করে জুতার তলা ক্ষয় করতে হয়। আমাদের দেশের মানুষের না আছে সে ধরনের চিন্তাভাবনা, না আছে জুতার ক্ষয়, না আছে সময়ের দামের যথাযথ মূল্যায়ন। যদি দেশের মানুষ স্বাভাবিকভাবে নিজের শ্রমঘণ্টার প্রতি মূল্যায়ন করতে পারত, তাহলে মানুষ সঠিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির দিকে বেশি মনোনিবেশ করত। মানুষকে শ্রমঘণ্টার বিশেষত্ব বুঝিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ব্যবস্থা করা গেলে স্বল্প আয়ের মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে পণ্য কিনতে হতো না। মানুষের কর্মক্ষমতা ও আয় বৃদ্ধি পেলে ক্রয়ক্ষমতাও স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পেত। যেমন—বৃক্ষরোপণের পর গোঁড়ায় পানি ঢালতে হয়, উপরে নয়; তবেই গাছ বড় ও মজবুত হয়। সমস্যার উৎপত্তিস্থলে সমাধান করলে নতুন সমস্যার সৃষ্টি হয় না। তাই সমস্যার উৎপত্তিস্থল, তথা কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টি এখানে একদম স্পষ্ট।
অতি সম্প্রতি শীর্ষ জাতীয় দৈনিকগুলোর প্রতিবেদন লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ১০০ টাকা সাশ্রয়ের জন্য মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। পত্রিকার প্রতিবেদনগুলোর শিরোনাম এমন— “এক কেজি গরুর মাংসের জন্য চার ঘণ্টা অপেক্ষা”—যা বড়ই পরিতাপের বিষয়। কারণ দেশে যদি শ্রমব্যবস্থা সুসংহত করা যেত বা বেকারত্ব দূর করা যেত, তাহলে ১০০ টাকা সাশ্রয়ের জন্য কেউ চার ঘণ্টা অপেক্ষা করত না। অথচ চার ঘণ্টা কাজ করলে একাধিক কেজি গরুর মাংস ক্রয় করা সম্ভব। চরম দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে কর্মসংস্থানের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় টিসিবির পণ্যের জন্য ট্রাকের পেছনে মানুষের দৌড়ানো কিংবা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা—এই বাস্তবতাই তার প্রতিফলন। আমি আমার লেখা একটি আর্টিকেলে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলাম, কীভাবে কর্মসংস্থান দ্বিগুণ করা সম্ভব। আর্টিকেলটি প্রকাশিত হয়েছিল দৈনিক মানবকণ্ঠে (১৯.১১.২০২৫ তারিখে)। দেশের অবস্থা যেখানে আছে, সেখান থেকেই কর্মসংস্থান দ্বিগুণ করা সম্ভব।
তবে টিসিবির পণ্যের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় স্পষ্ট—একটি হলো শ্রমঘণ্টার মূল্যায়ন তথা মানুষের কর্মসংস্থান, অপরটি হলো টিসিবির পণ্য বিতরণকে আরও কীভাবে আধুনিকায়ন করে খুব সহজে মানুষের হাতের নাগালে আনা যায়। যেখানে মানুষের লাইনে দাঁড়াতে হবে না—সে ব্যবস্থা করা গেলে টিসিবির পণ্য সংগ্রহের এই প্রহসন থেকে দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষদের মুক্তি দেওয়া সম্ভব হবে।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *