খাদ্যশৃঙ্খলে বিষাক্ত ভারী ধাতু ও এএমআর: মোকাবিলায় ‘ওয়ান হেলথ’ মডেলে গবেষণায় নামছে বাকৃবি

বাকৃবি প্রতিনিধি:  

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর)—এই দুই সংকট একসঙ্গে জনস্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তাকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাণিসম্পদ খাতে অযাচিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার ও পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রভাবে জীবাণুর ওষুধ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ছে, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) হাতে নিয়েছে একটি সময়োপযোগী গবেষণা উদ্যোগ।

বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ নজরুল ইসলাম সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ইনসেপশন কর্মশালার মধ্য দিয়ে প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। ‘ওয়ান হেলথ কাঠামোর মাধ্যমে প্রাণিসম্পদ পরিবেশব্যবস্থায় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলা ও খাদ্য নিরাপত্তা সুরক্ষায় ক্লাইমেট-স্মার্ট কৌশল’ শীর্ষক এ গবেষণা বাস্তবায়ন করছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগ।

বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর ‘হিট’ প্রকল্পের অর্থায়নে পরিচালিত এ গবেষণা কার্যক্রম চলবে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত।

গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো—জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে প্রাণিসম্পদের মাধ্যমে মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে এএমআর ও ভারী ধাতব দূষণ ছড়িয়ে দিচ্ছে, তার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করা এবং টেকসই, জলবায়ু-সহিষ্ণু কৌশল উদ্ভাবন করা। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ গবেষণার ফলাফল ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রকল্পের প্রধান ব্যবস্থাপক ও ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মাহমূদুল হাসান শিকদার। তিনি বলেন, ‘তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও চরম আবহাওয়ার কারণে খামার ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসছে, যা রোগজীবাণুর ধরন বদলে দিচ্ছে। এর ফলে খামারিরা অনিয়ন্ত্রিতভাবে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ব্যবহার করছেন, যা পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি মানবদেহে ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণু ছড়িয়ে দিচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই প্রকল্প কেবল সমস্যার গভীরে যাবে না, বরং টেকসই সমাধানও খুঁজবে। গবেষণার অংশ হিসেবে উদ্ভাবন করা হবে ‘ক্লাইমেট-স্মার্ট’ প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনা। এর মধ্যে রয়েছে উন্নত বায়োসিকিউরিটি যা খামারে জীবাণুর প্রবেশ ঠেকাতে আধুনিক সুরক্ষা ব্যবস্থা। বিকল্প চিকিৎসা অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমাতে প্রোবায়োটিক ও উদ্ভিদজাত (হার্বাল) ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রাণিজ বর্জ্য থেকে পরিবেশে জীবাণু ছড়িয়ে পড়া রোধে কার্যকর মডেল তৈরি।’

ইনসেপশন কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাকৃবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া বলেন, ‘বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে গবেষণার বিকল্প নেই। শিক্ষার্থীদের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পর্যায় থেকেই গবেষণামুখী করে তুলতে হবে, যাতে তারা ভবিষ্যৎ জনস্বাস্থ্য রক্ষায় দক্ষ ভূমিকা রাখতে পারে।’

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কাজী রফিকুল ইসলাম বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ‘ওয়ান হেলথ’ বা এক স্বাস্থ্য ধারণার ওপর জোর দেন। তিনি জানান, মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্য একে অপরের পরিপূরক। একটির বিপর্যয় অন্য দুটিকে ঝুঁকিতে ফেলে।

ফার্মাকোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. জান্নাতুল ফেরদৌসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ভেটেরিনারি সায়েন্স অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. বাহানুর রহমান এবং বাকৃবি রিসার্চ সিস্টেমের পরিচালক অধ্যাপক ড. এম. হাম্মাদুর রহমান।

গবেষক দল আশা করছেন, ২০২৮ সালের মধ্যে এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রাপ্ত ফলাফল দেশের প্রাণিসম্পদ নীতিমালায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি সামলে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *