
কৃষিবিদ ডা. মো. মোর্শেদুল আলম:
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের জ্বালানি তেল উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। যুদ্ধ বা রাজনৈতিক অস্থিরতা এই অঞ্চলে বৈশ্বিক বাজারে দ্রুত প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ, যা মূলত আমদানিনির্ভর, বিশেষ করে তেল, সার ও খাদ্যশস্যের ক্ষেত্রে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। তেলের দাম বেড়ে গেলে সরাসরি প্রভাব পড়ে কৃষি উৎপাদন ও কৃষকের খরচে।
কৃষিখাতের সঙ্গে জ্বালানির সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। সেচ, জমি প্রস্তুত, ফসল পরিবহন—সবকিছু ডিজেল বা বিদ্যুতের ওপর নির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলে সেচ খরচ বৃদ্ধি পায়, সার ও কীটনাশক আমদানির খরচ বাড়ে। এতে কৃষক পর্যাপ্ত সার ব্যবহার করতে পারছে না, ফলশ্রুতিতে ফসলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং খাদ্যের বাজারে দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সম্ভাব্য কৃষি সংকট:
১. সেচ ও উৎপাদন ঝুঁকি: ডিজেলনির্ভর সেচ খরচ বেড়ে কৃষক প্রয়োজন অনুযায়ী পানি দিতে পারছে না।
২. উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি: ডিজেল, সার, কীটনাশক ও পরিবহনের খরচ বাড়ায় কৃষকের লাভ কমে যাচ্ছে।
৩. সরবরাহ ব্যাহত: পরিবহন খরচ বেড়ে মাঠ থেকে বাজারে পণ্য পৌঁছাতে দেরি হয়, পচনশীল পণ্যের ক্ষতি বৃদ্ধি পায়।
৪. খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি: উৎপাদন কমে ও সরবরাহ ব্যাহত হলে খাদ্য ঘাটতি দেখা দিতে পারে, দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়।
সম্ভাব্য সমাধান:
১. বিকল্প শক্তি ব্যবহার: সৌরশক্তি ও বায়োগ্যাস ব্যবহার করে ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমানো।
২. দক্ষ সেচ প্রযুক্তি: ড্রিপ ও স্প্রিঙ্কলার পদ্ধতি কম খরচে বেশি ফলন নিশ্চিত করে।
৩. স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি: দেশীয় জৈব সার ও কৃষি উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো।
৪. কৌশলগত মজুদ ও ভর্তুকি: ডিজেল ও সার পর্যাপ্ত মজুদ এবং কৃষি ভর্তুকি বৃদ্ধি করে কৃষক সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
৫. স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি: আইওটি-ভিত্তিক সয়েল সেন্সর ব্যবহার করে সেচ ও সার প্রয়োগ হ্রাস এবং উৎপাদন বৃদ্ধি।
৬. সমবায় ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা: কৃষকরা সম্মিলিতভাবে সেচ যন্ত্র ও উপকরণ ব্যবহার করলে খরচ ভাগাভাগি হয় এবং উৎপাদন আরও কার্যকর হয়।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার গুরুত্ব:
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বাংলাদেশের কৃষিখাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, বিকল্প শক্তির প্রসার এবং কার্যকর নীতিমালা গ্রহণের মাধ্যমে এই সংকট নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
দূরদর্শী পদক্ষেপ নিলে কৃষিখাত শুধু অস্থিরতার প্রভাব সহ্য করতে সক্ষম হবে না, বরং টেকসই ও সহনশীল খাতে পরিণত হবে। গবেষণা, উদ্ভাবন এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব, যা বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।