ব্লাস্ট প্রতিরোধী ও পুষ্টিসমৃদ্ধ ‘বিনা ধান২৭–২৮’ উদ্ভাবন

বাকৃবি প্রতিনিধি:

দীর্ঘ গবেষণার ফল হিসেবে আমন ধানের নতুন দুইটি উচ্চফলনশীল ও রোগ প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা)। ‘বিনা ধান২৭’ ও ‘বিনা ধান২৮’ নামে উদ্ভাবিত এ দুটি জাত সম্প্রতি সারাদেশে চাষাবাদের জন্য অনুমোদন পেয়েছে।

সম্প্রতি জাতীয় বীজ বোর্ড-এর ১১৫তম সভায় জাত দুটি অনুমোদন দেওয়া হয়। সভাটি কৃষি মন্ত্রণালয়-এ অনুষ্ঠিত হয়। নতুন দুটি জাত অনুমোদনের মধ্য দিয়ে বিনার উদ্ভাবিত ধানের মোট জাতের সংখ্যা দাঁড়াল ২৮টিতে।

বিনা সূত্রে জানা গেছে, উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের গবেষকরা দীর্ঘ গবেষণার মাধ্যমে উচ্চফলন, উন্নত পুষ্টিগুণ এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সমন্বয়ে এই দুটি জাত উদ্ভাবন করেছেন।

ধানের অন্যতম ক্ষতিকর রোগ ব্লাস্ট মোকাবিলায় ‘বিনা ধান২৭’ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেশের প্রথম ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী উচ্চফলনশীল আমন ধান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এ জাতের ধানে পিআইনাইন (Pi9) ও পিশ (Pish) নামের দুটি কার্যকর প্রতিরোধী জিন সংযোজন করা হয়েছে, যা ব্লাস্ট রোগের আক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সহায়তা করবে।

বিনার উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের প্রধান ড. ফাহমিনা ইয়াসমীন বিনা ধান২৭ সম্পর্কে জানান, ‘১২০ থেকে ১২৫ দিনের জীবনকাল সম্পন্ন এই জাতটির গাছের উচ্চতা ৯৫ থেকে ১০০ সেন্টিমিটার, ফলে ঝড়ো হাওয়ায় সহজে হেলে পড়ে না। প্রতিকূলতা জয় করে হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ৬ থেকে ৬ দশমিক ৫ টন এবং অনুকূল পরিবেশে তা ৭ টন পর্যন্ত পাওয়া সম্ভব। প্রচলিত জাতের তুলনায় এটি হেক্টরপ্রতি প্রায় এক থেকে আড়াই টন বেশি উৎপাদন দিতে সক্ষম। এছাড়া নিয়মিত ভাতভিত্তিক খাদ্যাভ্যাসে পুষ্টির ঘাটতি পূরণেও এটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে।’

অন্যদিকে বিনা ধান২৮ সম্পর্কে ড. ফাহমিদা জানান, ‘আমন মৌসুমে চাষাবাদের জন্য সুগন্ধি ও মাঝারি চিকন চালের নতুন জাত ‘বিনা ধান ২৮’ কৃষকের মাঝে দারুণ সাড়া ফেলতে পারে। মার্কার অ্যাসিস্টেড ব্যাকক্রসিং পদ্ধতিতে উদ্ভাবিত এই ধানের প্রতি কেজিতে জিংকের পরিমাণ ২৪ দশমিক ৮৩ মিলিগ্রাম। শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও গর্ভবতী নারীদের পুষ্টি চাহিদা মেটাতে এই জিংকসমৃদ্ধ চাল হতে পারে আশীর্বাদ।’

বিনা ধান২৮ এর উদ্ভাবক একই বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মাহমুদুল হাসান জানান, ‘বিনা ধান২৮ উন্নত সংকরায়ন ও মার্কার এসিস্টেড ব্যাকক্রসিং পদ্ধতিতে উদ্ভাবিত একটি উচ্চ ফলনশীল, সুগন্ধি ও মাঝারি চিকন চালবিশিষ্ট আমন ধানের জাত। আমরা বিশ্বাস করি, এটি কৃষক ও ভোক্তা উভয়ের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় করে তুলবে এবং দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই ধানের জীবনকাল ১২০-১২৫ দিন এবং গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৬ দশমিক ৫ টন। চালের অ্যামাইলোজ ২৭ দশমিক ৪২ শতাংশ হওয়ায় ভাত ঝরঝরে ও সুস্বাদু হয়। সুগন্ধি হলেও এই জাত চাষে বাড়তি কোনো ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন নেই, যা উৎপাদন খরচ কমাবে। বাজারে এই জাতের চাল ‘গরীবের পোলাও’ হিসেবে জনপ্রিয়তা পেতে পারে বলে।’

বিনার মহাপরিচালক ড. মো. শরিফুল হক ভূঞা বলেন, ‘বিনা ধান২৮ দেশের সর্বোচ্চ উচ্চফলনশীল সুগন্ধি আমন জাত হিসেবে কৃষি খাতে একটি যুগান্তকারী সংযোজন। আলোক অসংবেদনশীলতা, উচ্চ ফলন, পুষ্টিগুণ ও সুগন্ধ—সব মিলিয়ে এটি কৃষকের আয় বৃদ্ধি, ভোক্তার পুষ্টি নিশ্চিতকরণ এবং সুগন্ধি চালের বাজারে ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *