
কৃষিবিদ ডাঃ মোঃ মোর্শেদুল আলম
ঈদ মানেই খুশি, ঈদ মানেই আনন্দ। মুসলমানদের জীবনে এই দিনটি কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়—এটি ভালোবাসা, ক্ষমা, সহমর্মিতা এবং পুনর্মিলনের এক অনন্য উপলক্ষ। সারা বছরের জমে থাকা অভিমান, দূরত্ব আর ব্যস্ততা ভুলে গিয়ে পরিবার-পরিজন একত্রিত হওয়ার যে সুযোগ এনে দেয় ঈদ, তা সত্যিই অতুলনীয়। অনেকের কাছে এই মিলনমেলাই মহান আল্লাহর এক বিশেষ রহমত, যা মানুষকে আবার নতুন করে সম্পর্ক গড়ার শক্তি দেয় এবং পারিবারিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে তোলে।
বাংলাদেশে ঈদের এই আবহ আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। শহরের কোলাহল থেকে গ্রামবাংলার সরলতায়—সবখানেই ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ। নতুন পোশাক, সুস্বাদু খাবার, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা—সবকিছুর মধ্যেই থাকে এক ধরনের আন্তরিকতা ও আনন্দ। ঈদ আসে, ঈদ যায়, কিন্তু রেখে যায় অসংখ্য স্মৃতি। তেমনই এবারের ঈদে এক ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতার সাক্ষী হওয়ার সুযোগ হয়েছে, যা দীর্ঘদিন মনে গেঁথে থাকবে।
এবার ঈদের ছুটিতে সহকর্মী মোফাজ্জল ভাইয়ের গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার পরিকল্পনা করি। নির্ধারিত দিনে সকাল ৯টায় আমার বড় মেয়ে মার্জিয়া মারিয়াম (৭) সহ যাত্রা শুরু করি। রংপুর মেডিকেল মোড় থেকে বাসে করে সৈয়দপুর, সেখান থেকে আবার নীলফামারীর পথে যাত্রা। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে দারোয়ানী টেক্সটাইল মোড়ে পৌঁছালে দেখি মোফাজ্জল ভাই মোটরসাইকেল নিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। দূর থেকেই তার আন্তরিক হাসি যেন ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়।
মোফাজ্জল ভাই স্বভাবতই একজন প্রাণবন্ত ও হাসিখুশি মানুষ। দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করার সুবাদে তার কাছ থেকে পরিবার ও গ্রামের নানা গল্প শুনেছি। সেই গল্পগুলো থেকেই মনে মনে এক সুন্দর, স্নিগ্ধ গ্রামের ছবি তৈরি হয়েছিল। বাস্তবে সেখানে গিয়ে সেই কল্পনার সঙ্গে বাস্তবের মিল খুঁজে পাওয়া ছিল এক অন্যরকম অনুভূতি।
দারোয়ানী এলাকা বেশ ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ। উত্তরা ইপিজেড, বিজিবি ক্যাম্পসহ নানা স্থাপনার কারণে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব রয়েছে। বাজারে প্রবেশ করতেই বোঝা গেল মোফাজ্জল ভাই কতটা সবার পরিচিত ও প্রিয় মানুষ। চারপাশে মানুষের সঙ্গে তার সহজ সম্পর্ক এবং আন্তরিকতা চোখে পড়ার মতো। মোটরসাইকেলে গ্রামের দিকে এগোতে এগোতে পথের দুই পাশে সবুজ মাঠ, ছোট দোকান, মানুষের হাসিমুখ—সব মিলিয়ে এক প্রশান্তির আবহ তৈরি করে।
অবশেষে পৌঁছালাম নগর দারোয়ানী মোল্লাপাড়ার বসুনিয়া পরিবারের বাড়িতে। বাড়ির প্রবেশমুখেই যেন ঐতিহ্যের ছোঁয়া পাওয়া যায়। পরিবারের কর্তা-জনার সফিয়ার রহমান বসুনিয়া, প্রায় ৮৫ বছর বয়সী এক প্রবীণ ব্যক্তি—যিনি প্রায় ৩৫ বছর আগে স্ত্রীকে হারিয়েছেন—আজও পরিবারের বটবৃক্ষ হয়ে সবার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। তার পাঁচ ছেলে ও দুই মেয়ে—সকলেই নিজ নিজ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত, যা একটি সুসংগঠিত ও মূল্যবোধসম্পন্ন পরিবারের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে।
মোফাজ্জল ভাই একে একে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। বিশেষ করে তার বাবার সঙ্গে পরিচয় ছিল গভীরভাবে অনুপ্রেরণাদায়ক। বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও তার ব্যক্তিত্ব, দৃঢ়তা ও কণ্ঠে এখনো নেতৃত্বের ছাপ স্পষ্ট। একসময় সমাজসেবা ও রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা এই মানুষটি গ্রামের মানুষের কাছে ছিলেন আস্থার প্রতীক। গ্রামের মসজিদের সভাপতির দায়িত্ব তিনি দীর্ঘদিন পালন করেছেন, যা বর্তমানে তার বড় ছেলে নিষ্ঠার সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে তিনি অধিকাংশ সময় ঘরেই ইবাদতে কাটান, কিন্তু তার উপস্থিতি এখনো পরিবারের সবার জন্য এক অনুপ্রেরণা।
দিনটি কেটে গেল এক অনন্য পরিবেশে। আন্তরিক আতিথেয়তা, সুস্বাদু খাবার, গল্প আর হাস্যোজ্জ্বল মুহূর্তে ভরে উঠেছিল পুরো সময়টা। পরিবারের ছোট সদস্যদের সঙ্গে আড্ডা, খেলা আর হাসি-ঠাট্টা দিনটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। গ্রামীণ জীবনের সরলতা ও মানুষের আন্তরিকতা যেন মনকে গভীরভাবে ছুঁয়ে যায়।
এই অভিজ্ঞতা নতুন করে উপলব্ধি করায়—ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য কেবল নতুন পোশাক, সেমাই বা কোরবানির আনন্দে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর আসল তাৎপর্য লুকিয়ে আছে পারিবারিক বন্ধন, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং একসঙ্গে থাকার আনন্দে।
ঈদ আসে, ঈদ যায়—কিন্তু এমন কিছু মুহূর্ত থেকে যায়, যা মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে থাকে। এই ঈদের স্মৃতি তেমনই এক মূল্যবান সম্পদ, যা সময়ের সাথে আরও গভীর হয়ে উঠবে।